অঠিক রোগ নির্ণয় বিড়ম্বনাময়: বাতজ্বর (Rheumatic fever) বিড়ম্বনা

অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আবদুর রহিম ০৪:১৬ মিঃ, অক্টোবর ১০, ২০১৮ Views : 475

স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। কথাটি বাস্তব সত্য। জীবনে সবাই সুস্থ থাকতে চায়। কিন্তু অসুখ-বিসুখ তো পার্থিব জীবনে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। অসুখ-বিসুখে ভোগে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বড় ভাগ্যের ব্যাপার ।

অসুখ-বিসুখ হলে ভুক্তভোগীরা সাধারণত সুবিধামতো পছন্দমতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে যেতে পারেন। অপরদিকে চিকিৎসকের পবিত্র দায়িত্ব সঠিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত কষ্ট উপশম তথা রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা করা। অবশ্য যে কোন চিকিৎসা প্রদানের আগে সঠিকভাবে রোগনির্ণয় করা প্রত্যেক চিকিৎসকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সঠিকভাবে রোগনির্ণয় না করে চিকিৎসা শুরু করলে কত- যে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হতে পারে সে বিষয়েই কিছু বলতে চাই। বিষয়টি এমন হতে পারে যে আসলে রোগটি নেই কিন্তু ভুল ভাবে রোগনির্ণয় করে তার চিকিৎসা দেয়া হয়। ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে রোগ না-থাকা সত্ত্বেও তার চিকিৎসা দেয়া হয়। বিষয়টি অপ্রত্যাশিত, অগ্রহণযোগ্য এবং ক্ষেত্র বিশেষে মারাত্মক। কেউ যদি কোন রোগে না-ভোগে অযথা কেন তাকে সে-রোগের চিকিৎসা দেয়া হবে? কিন্তু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এরকম করা হয়।

এমন ঘটনা শুধু যে আমাদের দেশেই ঘটে তা কিন্তু নয় বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে। কিন্তু কেন ঘটে? সে-ব্যাপারেই উদাহরণসহ একটু আলোকপাত করতে চাই। আশা করি এতে সচেতনতা বাড়বে এবং আমরা সংশ্লিষ্ট সবাই এই অপ্রত্যাশিত বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাব। অনেকেই অযথা অঠিক অযৌক্তিক চিকিৎসার বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাবে।

আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় বাতজ্বর (Rheumatic fever)। বিশেষ করে বাতজ্বর না-থাকা সত্ত্বেও কেন এত ব্যাপকহারে বাতজ্বর হিসাবে চিহ্নিত করা হয় এবং অযথা বাতজ্বরের চিকিৎসা দেয়া হয়? বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হতে পারে কিন্তু বাস্তব।

আমাদের কাছে প্রায়শই এমন রোগী বা রোগীর অভিভাবক এসে বলেন রোগীর বাতজ্বর আছে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কীভাবে বুঝলেন যে রোগীর বাতজ্বর হয়েছে? সাথে সাথে দৃঢ়তার সাথে ঝটপট উত্তর দিয়ে থাকেন রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। আর সাথে সাথে রক্ত পরীক্ষার একাধিক রিপোর্ট চোখের সামনে মেলে ধরেন যেখানে দেখা যায় কিছুদিন পর পর রক্তের এএসও টাইটার (ASO titre) পরীক্ষা করা হয়েছে যার পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি। সবকিছু দেখে মনে হয় ভাবটা এমন যে রক্তের এএসও টাইটার (ASO titre) স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে একটু বেশি মানেই বাতজ্বর একেবারে নিশ্চিত আর কোন সন্দেহ নেই। বাস্তবে কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। শুধু রক্তের এএসও টাইটার (ASO titre) পরীক্ষা করে বাতজ্বর নির্ণয়ের কোন সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে এমন কোন সুনির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা বা অন্য কোন পরীক্ষা নেই যা দিয়ে বাতজ্বর সুনিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায়।

তবে কীভাবে বাতজ্বর সুনিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায়? রোগীর সার্বিক উপসর্গ এবং লক্ষণাদি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে এবং এর সাথে সুনির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অনেকটা নিশ্চিতভাবে বাতজ্বর (Rheumatic fever) চিহ্নিত করা যায়। এক কথায় বলতে গেলে বাতজ্বর নির্ণয়ের সুনির্দিষ্ট একক কোন পরীক্ষা নেই। কিন্তু অপ্রত্যাশিত হলেও সত্য আমাদের মাঝে এমন অনেক চিকিৎসক আছেন যারা শুধু রক্তের এএসও টাইটার (ASO titre) বেশি পেলেই রোগীর বাতজ্বর (Rheumatic fever) শনাক্ত করে থাকেন এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা শুরু করে থাকেন। বিষয়টি মোটেও সমীচীন নয়। এতে রোগীর কোন উপকার হয়না বরং দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তি বাড়ে। সুতরাং চিকিৎসা শুরুর আগে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা অবশ্যই উচিত। কিন্তু সঠিকভাবে রোগীর বাতজ্বর (Rheumatic fever) নির্ণয়ের উপায় কি? এখন সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই।

অবশ্য বাতজ্বরের সূত্রপাত হতে পারে গলা ব্যথার দুই থেকে চার সপ্তাহ পর বিভিন্ন উপসর্গ ও লক্ষণ প্রকাশের মাধ্যমে। আবার গলা ব্যথা হলেই যে বাতজ্বর হবে তা কিন্তু নয়। গলা ব্যথার অনেক কারণ আছে তবে বিশেষ জীবাণুর কারণে গলা ব্যথা হলে পরবর্তীতে বাতজ্বরের সম্ভাবনা থাকে। বাতজ্বর নির্ণয়ের নির্ধারকসমূহ (Criteria) অর্থাৎ উপসর্গ ও লক্ষণ সমূহ দুই প্রকার। বড় নির্ধারকসমূহ (Major criteria) এবং ছোট নির্ধারকসমূহ (Major criteria)। বড় নির্ধারকসমূহ (Major criteria) পাঁচটি এবং ছোট নির্ধারকসমূহ (Minor criteria) ছয়টি।

বড় নির্ধারকসমূহ (Major criteria):

১) গিরার প্রদাহ (Arthritis)

২) হৃৎপিন্ডের প্রদাহ (Carditis)

৩) অনিচ্ছাকৃত হাত-পা সঞ্চালন (Sydeham’s chorea)

৪) ত্বকের লালচে দাগ (Erythema marginatum)

৫) ত্বকের নীচে গোটা (Subcutaneous nodules)

 ছোট নির্ধারকসমূহ (Minor criteria):

১) জ্বর (Fever)

২) গিরার ব্যথা (Arthralgia)

৩) অতিরিক্ত ইএসআর এবং/অথবা সি আর পি (Raised ESR and/CRP)

৪) আগের বাতজ্বর (Previous rheumatic fever)

৫) অতিরিক্ত শ্বেতকণিকা (Leucocytosis)

৬) ই.সি.জিতে অতিরিক্ত পিআর বিরতি (Increased PR interval in E.C.G/First-degree heart block)

কোন রোগীর যদি দুইটি বড় নির্ধারক অথবা একটি বড় এবং দুইটি ছোট নির্ধারক থাকে তবে মনে করা হয় রোগী বাতজ্বরে (Rheumatic fever) আক্রান্ত। অবশ্য সাথে যদি এএসও টাইটার (ASO titre) স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় থাকে তবে তা রোগ নির্ণয়ের সমর্থক মনে করা হয়। তবে শুধু এএসও টাইটার (ASO titre) স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় থাকলেই বাতজ্বর বলা উচিত নয়। কিন্তু ভুল ধারণাবশত কিংবা

অজ্ঞতাবশত অনেকেই শুধু এএসও টাইটার (ASO titre) স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় থাকলেই বাতজ্বর চিহ্নিত করে থাকেন এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা শুরু করে থাকেন। অবশ্য বাতজ্বরের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা খুব একটা সহজসাধ্য নয় বরং অনেক কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়বহুল। আর এই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ব্যাপারে রোগীর কিংবা রোগীর আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা পাওয়াও সহজ নয়। তা ছাড়া রোগে না-ভুগে কেন অযথা অযৌক্তিক দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা নিতে হবে?

অবশ্য বাতজ্বর সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না কিন্ত বাতজ্বরের ফলে হৃৎপিন্ডে স্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিতে পারে যা আজীবন থাকে এবং পরবর্তী জটিলতা আরো মারাত্মক হতে পারে। সুতরাং সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করে তার যথাযথ চিকিৎসা প্রদান অবশ্যই প্রয়োজন। বাতজ্বরের চিকিৎসা দেয়ার পর পরবর্তীতে আর যাতে আবার না-হয় তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিতে হয়।

চিকিৎসাঃ

চিকিৎসার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য উপসর্গ ও লক্ষণসমূহ উপশম করা এবং কোন স্থায়ী ক্ষতি প্রতিরোধ করা। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্রাম, জীবাণুনাশক (Antibiotics), ব্যথানাশক বিশেষ করে এসপিরিন (Aspirin), গ্লুকোকর্টিকয়েডস (Glucocorticoids) এবং প্রয়োজনে হার্ট ফেইলিয়ুরের চিকিৎসা (Treatment of cardiac failure) ।

বিশ্রামঃ গিরার ব্যথা এবং হৃৎপিন্ডের কার্যভার কমানোর জন্য বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের তাপমাত্রা, অতিরিক্ত শ্বেতকণিকা (Leucocytosis) এবং অতিরিক্ত ইএসআর (Raised ESR) স্বাভাবিক পর্যায়ে আসা পর্যন্ত বিশ্রাম প্রয়োজন।

জীবাণুনাশক (Antibiotics): বেঞ্জাথিন বেঞ্জাইল পেনিসিলিন (১.২ মিলিয়ন ইউনিট) মাংসপেশিতে মাত্র এক বার অথবা ফেনোক্সিমেথাইল পেনিসিলিন ২৫০ মিলিগ্রাম বড়ি দিনে চারবার মুখে সেবন করতে হবে ১০ দিন।

ব্যথানাশক (Aspirin): গিরার ব্যথা উপশমের জন্য এসপিরিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পর্যাপ্ত সময় পর্যন্ত দিতে হবে।

১) গ্লুকোকর্টিকয়েডস (Glucocorticoids): অতিরিক্ত গিরার প্রদাহ অথবা হৃৎপিন্ডের প্রদাহ (Carditis) থাকলে গ্লুকোকর্টিকয়েডস প্রয়োজন হতে পারে।

২) হার্ট ফেইলিয়ুরের চিকিৎসা (Treatment of cardiac failure): হার্ট ফেইলিয়ুর থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা দিতে হবে।

একবার বাতজ্বর হলে যেহেতু আবার হতে পারে এবং হৃৎপিন্ডের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে সেজন্য প্রথম পর্যায়ের চিকিৎসার পর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা দিতে হয়। বেঞ্জাথিন বেঞ্জাইল পেনিসিলিন (১.২ মিলিয়ন ইউনিট) মাংশপেশিতে প্রতি মাসে একবার অথবা ফেনোক্সিমিথাইল পেনিসিলিন ২৫০ মিলিগ্রাম বড়ি দিনে দুইবার মুখে সেবন করতে হবে। শেষ বাতজ্বরের পর দশ বছর অথবা চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যেটি দীর্ঘতম সেই সময় পর্যন্ত এই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা চালাতে হবে।