এলার্জিজনিত রোগ ও চিকিৎসা

ডাঃ রোখসানা আফরোজ ১২:৫১ মিঃ, অক্টোবর ১১, ২০১৮ Views : 1016

এলার্জি রোগের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে অনেক বেশি। বাচ্চা থেকে বুড়ো- প্রায় সবাই এই রোগে কোন না কোন সময়ে আক্রান্ত হয়। এলার্জিতে হাঁচি কাশি থেকে শুরু করে খাদ্য ও ওষুধের ভীষণ প্রতিক্রিয়া ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে এলার্জি সামান্যতম অসুবিধা করে আবার কারও ক্ষেত্রে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় ধূলো এসে লাগল মুখে, তখনই শুরু হয়ে গেল হাঁচি এবং পরে শ্বাসকষ্ট অথবা ফুলের গন্ধ নেয়ার সময় বা গরুর মাংস, চিংড়ি, ইলিশ, গরুর দুধ খেলেই শুরু হলো গা চুলকানি বা চামড়ায় লাল লাল চাকা হয়ে ফুলে ওঠা। এগুলো হলে আপনার এলার্জি আছে ধরে নিতে হবে।

এলার্জি কী? কেন হয় এবং কী করেই বা এড়ানো যায়? তা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।

প্রত্যেক মানুষের শরীরে এক একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম থাকে, কোন কারণে এ ইমিউন সিস্টেমে গোলযোগ দেখা দিলে তখনই এলার্জির বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

এলার্জিঃ

আমাদের শরীরে কোন ক্ষতিকর বস্তু (পরজীবী, ছত্রাক, ভাইরাস, এবং ব্যাকটেরিয়া) বা অনাহূত বস্তু (ফরেইন বডি) প্রবেশ করলে দেহ সবসময় তা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টাকে রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া বা ইমিউনিটি বলে। কিন্তু কখনও কখনও আমাদের শরীর সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন অনেক ধরনের বস্তুকেও ক্ষতিকর ভেবে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন সব বস্তুর প্রতি শরীরের এ অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকে এলার্জি বলা হয়।

এলার্জিজনিত প্রধান সমস্যাসমূহঃ

● এলার্জিজনিত সর্দি বা এলার্জিক রাইনাইটিসঃ এর উপসর্গ হচ্ছে অনবরত হাঁচি, নাক চুলকানো, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, কারও কারও চোখ দিয়েও পানি পড়ে এবং চোখ লাল হয়ে যায়।

● এলার্জিক রাইনাইটিস দুই ধরনের

১। সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিস : বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এলার্জিক রাইনাইটিস হলে একে সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিস বলা হয়।

২। পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস : সারা বছর ধরে এলার্জিক রাইনাইটিস হলে একে পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস বলা হয়।

লক্ষণ উপসর্গঃ

* সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিস :

● ঘন ঘন হাঁচি

● নাক দিয়ে পানি পড়া

● নাসারন্ধ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া

● চোখ দিয়ে পানি পড়া

● চোখ লাল হওয়া ও চোখ চুলকানো ইত্যাদি।

* পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিস :

পেরিনিয়াল এলার্জিক রাইনাইটিসের উপসর্গগুলো সিজনাল এলার্জিক রাইনাইটিসের মতো। কিন্তু এক্ষেত্রে উপসর্গগুলোর তীব্রতা কম হয় এবং স্থায়ীত্ব বেশি হয়।

চিকিৎসা প্রতিকারঃ

● ধুলোবালি থেকে দূরে থাকা। রাস্তায় বের হওয়ার সময় ফেসমাস্ক ব্যবহার করা।

● যাদের অ্যালার্জির প্রবণতা আছে তাদের খাবার গ্রহনে সাবধানতা অবলম্বন করা। একেক জনের একেক খাবারের প্রতি সেনসিটিভিটি থাকে। সাধারনত গরুর মাংস, চিংড়ি, বেগুণ, ইলিশ মাছ ইত্যাদি খাবারের প্রতি সেনসিটিভিটি থাকে। এছাড়া অন্য যেকোন খাবারের প্রতি থাকতে পারে অ্যালার্জির প্রবনতা।

● ভিটামিন সি যুক্ত ফল খাওয়া।

● ডাক্তারের পরামর্শ মত অ্যান্টি-হিস্টামিন জাতীয় ওষুধ সেবন এবং প্রয়োজন হলে ইমিউনোলজিক্যাল পরীক্ষা করা।

এজমা বা হাঁপানি :

এজমা রোগের প্রধান প্রধান উপসর্গ বা লক্ষণগুলো হলো-

● ঘন ঘন শুষ্ক কাঁশি

● শ্বাস নিতে ও ছাড়তে কষ্ট

● দম বন্ধ ভাব বা খাটো অর্থাৎ ফুসফুস ভরে দম নিতে না পারা

● বুকের ভেতর বাঁশির মতো সাঁই সাঁই আওয়াজ

● রাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকা

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাঃ

● বুকের এক্স-রে : হাঁপানি রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করার আগে অবশ্যই বুকের এক্স-রে করে দেখা দরকার যে অন্য কোনো কারণে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কিনা।

● স্পাইরোমেট্রি বা ফুসফুসের ক্ষমতা দেখা : এটা পরীক্ষা করে রোগীর ফুসফুসের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা

● ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার বা ওষুধ সেবন করা।

● হাঁপানি রোগের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার নেই। তবে কাশি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে এমন ঠান্ডা পরিবেশ পরিহার করা, অ্যালার্জেন থেকে দূরে থাকা, দূষনমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরনের মাধ্যমেই এর প্রতিরোধ সম্ভব।

আর্টিকেরিয়া :

আর্টিকেরিয়ার ফলে ত্বকে লালচে ফোলা ফোলা হয় এবং ভীষণ চুলকায়। ত্বকের গভীর স্তরে হলে, মুখ, হাতপা ফুলে যেতে পারে। আর্টিকেরিয়ার ফলে সৃষ্ট ফোলা অংশগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী থাকে কিন্তু কখনও কখনও বার বার হয়। যে কোনো বয়সে আর্টিকেরিয়া হতে পারে। তবে স্বল্পস্থায়ী আর্টিকেরিয়া বাচ্চাদের মধ্যে এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্টিকেরিয়া বড়দের মধ্যে দেখা যায়।

সংস্পর্শজনিত এলার্জিক ত্বক প্রদাহ/এলার্জিক কনটাক্ট ডারমাটাইটিস :

চামড়ার কোথাও কোথাও শুকনো, খসখসে, ছোট ছোট দানার মতো ওঠা। বহিস্থ উপাদান বা এলার্জেনের

সংস্পর্শে ত্বকে প্রদাহ হলে তাকে এলার্জিক কনটাক্ট ডারমাটাইটিস বলা হয়।

লক্ষণ ও উপসর্গঃ

● ত্বকে ছোট ছোট ফোঁসকা পড়া

● ফোঁসকাগুলো ভেঙে যাওয়া ও চুয়ে চুয়ে পানি পড়া

● ত্বকের বহিরাবরণ ওঠে যাওয়া

● ত্বক লালচে হওয়া এবং চুলকানো

● চামড়া ফেটে আঁশটে হওয়া

একজিমা :

একজিমা বংশগত চর্মরোগ যার ফলে ত্বক শুষ্ক হয়, চুলকায়, আঁশটে এবং লালচে হয়। খোঁচানোর ফলে ত্বক পুরু হয় ও কখনও কখনও ওঠে যায়। এর ফলে জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত ত্বক থেকে চুয়ে চুয়ে পানি পড়ে এবং দেখতে ব্রণ আক্রান্ত বলে মনে হয়। এটা সচরাচর বাচ্চাদের মুখে ও ঘাড়ে এবং হাত ও পায়ে বেশি দেখা যায়।

এলার্জিক কনজাংটিভাইটিস :

● চোখে চুলকানো, চোখ লাল হয়ে যাওয়া

খাওয়ায় এলার্জি :

উপসর্গঃ পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া এবং ডায়রিয়া।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জনিত এলার্জি :

 এটা খুবই মারাত্মক। এলারজেন শরীরের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে এটা শুরু হয়ে যেতে পারে। নিম্নে উল্লিখিত উপসর্গগুলো হতে পারেঃ-

● চামড়া লাল হয়ে ফুলে ওঠে, চুলকায়

● শ্বাসকষ্ট, নিশ্বাসের সঙ্গে বাঁশির মতো আওয়াজ

● মূর্ছা যেতে পারে

● রক্তচাপ কমে গিয়ে রোগী শকে চলে যেতে পারে বা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

সাধারণ এলার্জি উৎপাদকগুলো :

● মাইট

● মোল্ড

● ফুলের রেণু বা পরাগ

● ঠান্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়া

● খাদ্যদ্রব্য

● ঘরের ধুলো ময়লা

● প্রাণীর পশম এবং চুল

● পোকা মাকড়ের কামড়

● ওষুধসহ কিছু রাসায়নিক দ্রব্যাদি

● প্রসাধন সামগ্রী, উগ্র সুগন্ধী বা তীব্র দুর্গন্ধ

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা :

● রক্ত পরীক্ষা বিশেষত : রক্তে ইয়োসিনোফিলের মাত্রা বেশি আছে কিনা, তা দেখা।

● সেরাম ইমিউনোগ্লোবিউলিন ই এর মাত্রা : সাধারণত এলার্জি রোগীদের ক্ষেত্রে আইজিইর (IgE)মাত্রা বেশি থাকে।

● স্কিন টেস্ট : এ পরীক্ষায় রোগীর চামড়ার উপর বিভিন্ন এলার্জেন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং এ পরীক্ষাতে কোন কোন জিনিসে রোগীর এলার্জি আছে তা ধরা পড়ে।

● প্যাচ টেস্ট : এ পরীক্ষায় রোগীর ত্বকের ওপর করা হয়।

● বুকের এক্স-রে

সমন্বিতভাবে এলার্জির চিকিৎসা হলো :

● এলার্জেন পরিহার : যখন এলার্জির সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তা পরিহার করে চললেই সহজ উপায়ে এলার্জি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

● ওষুধ প্রয়োগ : এলার্জি ভেদে ওষুধ প্রয়োগ করে এলার্জি উপশম অনেকটা পাওয়া যায়।

● এলার্জি ভ্যাকসিন বা ইমুনোথেরাপি : এলার্জি দ্রব্যাদি থেকে এড়িয়ে চলা ও ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিনও এলার্জিজনিত রোগীদের সুস্থ থাকার অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি। বর্তমান বিশ্বস্বাস্থ্য এ ভ্যাকসিন পদ্ধতির চিকিৎসাকে এলার্জিজনিত রোগের অন্যতম চিকিৎসা বলে অভিহিত করে।