সচেতনতাই সুস্থতা

নাজনীন নাহার, লেখক ও সাংবাদিক ০৪:২৮ মিঃ, অক্টোবর ৯, ২০১৮ Views : 509

সেদিন আমার বন্ধুর ৭ বছরের ছেলে আরিয়ানের প্রচন্ড পেট ব্যথা নিয়ে হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি। এই টেস্ট সেই টেস্ট, প্রথমে বলল এ্যাপেন্ডিসাইটিসের সমস্যা, অপারেশন করা লাগবে তবে আরো নিশ্চিত হতে তার আরো কিছু টেস্ট করাতে হবে। ভড়কে গেলাম আমরা। এত ছোট বাচ্চা, তার অপারেশন? যাক এ যাত্রায় বাঁচা গেল কারণ প্রথমদিনের রিপোর্টে একিউট অ্যাপেন্ডিসাইটিস এবং রিমার্কেবল ইন্ট্রাএবডোমিনাল গ্যাস এর উপস্থিতি দেখা গেলেও পরের দিনের রিপোর্টে একিউট অ্যাপেন্ডিসাইটিসের তীব্রতাটা ততটা দেখা যায়নি। ব্যথার কারণ খাদ্যাভাস হতে পারে বলে জানালেন তারা এবং বাইরের খাবার খেতে নিষেধ করে দিলেন। জানলাম আরিয়ান রোজ স্কুল হতে ফেরার সময় স্বাস্থ্যসম্মত নয় এরূপ চিপস খায়, সকালের নাস্তায় চিকেন ফ্রাইতো আছেই। সারাদেশে বর্তমানে শিশুদের এ ধরণের পেট ব্যথা এবং ওবেসিটি সাধারণ ঘটনা। বাচ্চাদের ফাস্টফুড আর ড্রিঙ্ক ছাড়া চলেই না। বড়রাও পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে, বাইরের খাবারে তাদের আগ্রহ কম নয়, এছাড়া বাধ্যবাধকতা তো আছেই । আবার বাইরে না খেয়ে বাহির থেকে কেনা উপকরণে ঘরে তৈরী খাবারেও তো আগের সেই দিন আর নাই। কারণ কম বেশি সব খাবারেই ভেজাল। তাহলে উপায় কি? স্বাস্থ্য সচেতনতা নাকি না খেয়ে থাকা ?

তবে স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল এটি একটি প্রবাদ বাক্য হলেও এটি এখন মানুষের বিশ্বাস । আবার স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে মানুষের মনোযোগ আগের তুলনায় বেশি। পাড়ায় পাড়ায় জিম এবং যোগ ব্যায়ামে মানুষের অংশগ্রহণ, অরগানিক পণ্যের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তারই প্রমাণ। তাছাড়া এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে বেশ কিছু সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ। তবে এটাও সত্য যে একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের ক্রমবর্ধিত স্বাস্থ্য জটিলতা মোকাবেলায় সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।

 স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলত স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থের উপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি প্রক্রিয়া যাতে অন্তভুক্ত ত থাকে সুষম খাবার, সঠিক সময়ে সঠিক খাবার, নিরাপদ পানীয়, নিয়মিত শরীর চর্চার মত বিষয়গুলো। সামাজিক, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগতভাবে এই সচেতনতা অত্যাবশ্যকীয় কেননা বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি প্রতিনিয়ত, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি আমাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থের উপর। তাই স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতার গুরুত্ব অপরিসীম।

সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও আগের তুলনায় স্বাস্থ্য সচেতনতায় মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। তদুপরি খাবারের ভেজাল বিষয়েও এখন মানুষ সচেতন। কিন্তু যেটুকু সচেতন, তা কি যথেষ্ট? কিংবা এই সচেতনতা কোন পর্যায়ে সেটা জানার বিষয়। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে হ্যাপি হোম এন্ড হেলথকেয়ার প্রকাশনীর তত্ত্বাবধানে “আমার স্বাস্থ্য” ত্রৈমাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ক ম্যাগাজিন ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন পেশার নিয়োজিত ৫০০ জন মানুষের উপর একটি জরিপ পরিচালনা করে যার উপর ভিত্তি করেই এই সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনী।

জরিপকৃত মানুষের মধ্যে ৭৪% বলেছেন তারা স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত বলে মনে করেন ৮১.৫০% মানুষ। ৬৮% নিয়মিত হাটেন। দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি খান। ৬০ ভাগ মানুষসপ্তাহে মাত্র ১ দিন লাল মাংস খান অর্থাৎ মোটামুটি আশানুরূপ পরিবর্তন বা সচেতনতা এসেছে মানুষের মধ্যে। ৬৯% মানুষ রোজ পরিমাণমতই ঘুমান। তারপরও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অসুখে ভুগে যাচ্ছে মানুষ। বিশ্বের বড় ডাক্তার মনে করেন এর অধিকাংশ রোগের সৃষ্টি আমাদের খাদ্যাভাস এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন সর্বোপরি ভেজালযুক্ত খাবার। সম্প্রতি করা এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী ৬১% মানুষ প্রতিদিন কোন না কোন বেলার খাবার ঘরের বাইরে খান। এক্ষেত্রে শিশুর সংখ্যাই বেশি অথচ জরিপে ৭৭% বলেছেন তারা তাদের শিশুর সুষম খাবারের ব্যাপারে সচেতন। হয়তো সত্যি তাই। কিন্তু সুষম খাবারের পাশাপাশি যদি বাইরের খাবারই বেশী খায় তবে সুষম খাবার কি কার্যকর হবে? বাইরের খাবার সবই যে খারাপ তা নয় তবে জরিপে বলছে ৯৫% ই ভেজাল এবং জীবাণুযুক্ত যা সব সময় স্বাস্থ্যকর নয়, তাছাড়া সম্প্রতি এক গবেষণায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন রাজধানীর বেশিরভাগ পথ বা হোটেলের খাবারেই বিভিন্ন ধরণের জীবাণু রয়েছে। তাই আমরা ব্যক্তিগত ভাবে হাত পরিষ্কার করে খেলেও লাভ নাই। কারণ মানুষ এখন সবজি খেতে চায়, জরিপে ৪৫% মানুষই সপ্তাহে ৪ দিন সবজি খান, কিন্তু সবজি কি ভেজাল মুক্ত?

কর্মজীবীরা অফিসের কাজের ফাঁকে কিংবা শিক্ষার্থীরা ক্লাসের ফাঁকে বাইরের দোকানে চা পান করে থাকে। চায়ের সাথে অনেক সময় দোকানে পলিথিনের ভেতর ঝুলিয়ে রাখা বিস্কুট বা কেকও খায় অনেকে। পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে খুব কি সচেতন ক্রেতারা? এধরণের খাবারে অনেক ধূলোবালি থাকে। দোকানীরা অনেক সময় ঠিকমত কাপও ধোয় না। ক্রেতারা হয়তো জেনেশুনেই ময়লা খাচ্ছে। দোকানী বা হোটেলের মালিকরা যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেন বলে জানালেও গবেষকরা বলছেন, রাজধানী ঢাকার ৫৭ শতাংশ পথ-খাবারে নানা ধরণের জীবাণু রয়েছে। বিক্রেতাদের ৮৮ শতাংশের হাতেই থাকে নানান জীবাণু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন একজন বিক্রেতা গড়ে প্রায় দেড়শো জনের কাছে পথ-খাবার বিক্রি করেন। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে চটপটি, ফুচকা, ঝালমুড়ি, পিঠা, রুটি পরোটা, শরবত, ডিমসেদ্ধসহ নানান খাবার। ঝালমুড়ি, ফুচকা, ভেলপুরীতে রয়েছে কৃত্রিম রং, ইস্ট, ই-কোলাই, কলিফর্ম, মাইকোটক্সিন, সালমোনেলার মতো শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সব উপাদান। বাজারে অধিকাংশ ফলই ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয়। এ ধরণের ফল যারা খেয়ে থাকেন তারা যেমন ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন যারা এই ওষুধ ফলের সঙ্গে দিচ্ছেন। এ ওষুধের ঝাঁজটা তারাই প্রথমে সরাসরি পাচ্ছেন। ওষুধ মেশানোর ফলে এর প্রাকৃতিক স্বাদ ও রঙ থাকে না, ফরমালিনযুক্ত মাছে এক ধরণের ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। ফলের মতোই মাছে ফরমালিন মেশালে এর প্রাকৃতিক রঙটি হারিয়ে যায়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি

ভেজাল অথবা বাইরের খাবার খেলে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাইরের খাবারগুলোতে সাধারণত পুরনো তেল ব্যবহার করা হয়, এটা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ছাড়া খাবারে যে রঙ ব্যবহার করা যায় তার দাম খুব বেশি হওয়ায় বাইরের অধিকাংশ খাবারে টেক্সটাইলের রঙ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরণের খাবার খেলে লিভার, কিডনি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অচলসহ ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত জায়গায় যদি খাবার তৈরি না করা হয় সেটাও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। খোলা তেল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার অপরিচ্ছন্নতার কারণে বাইরের খাবার খাওয়ার কারণে অনেক সময় টাইফয়েড, আমাশয়, ডায়রিয়া থেকে শুরু করে খাদ্য এবং পানি-বাহিত যেকোনো রোগের কারণ হতে পারে এইসব খাবার। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব খাবার খেয়ে শিশুরা পেটের পীড়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয় দীর্ঘ মেয়াদে কিডনির জটিল রোগ, লিভার সিরোসিস এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে এসব খাবারের কারণে।

কি করা?

যতটা সম্ভব বাইরের খোলা খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। বাইরের মুখরোচক খাবার সম্পর্কে পুষ্টি বিজ্ঞানীরা জানান, বাচ্চাদের স্কুলের টিফিনের বিষয়ে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হওয়া দরকার। তা না হলে আজকের শিশু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই ঘরে তৈরি খাবারে শিশুদের অভ্যস্ত করতে হবে। কখনও জেনে, কখনও না জেনে আমরা অনিরাপদ খাবার খাচ্ছি। নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান দায়িত্ব। ইদানিং পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বাজার করার দায়িত্বটি পালন করছে। এ ক্ষেত্রে কোনটাতে ফরমালিন আছে, কোনটাতে নেই এবং কীভাবে বোঝা যাবে এ জ্ঞানটুকু রাখতে হবে। কেনাকাটার পর ফলমূল, মাছ-তরকারি থেকে কীভাবে বিষাক্ত কেমিক্যাল দূর করা যায় তার জন্য নারীদেরই সচেতন হতে হবে। আমরা অনেক সময় ফ্রিজে খাবার রেখে দিয়ে পরে খাই। এতে কখনও কখনও ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়ে পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তারপর রান্না-বান্না করার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট তাপমাত্রার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো ধরণের খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। সুস্বাস্থ্যের জন্য কেমিক্যালযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। সচেতনতার বিকল্প নেই। এক সময় পুষ্টি সম্পর্কে মানুষ ততটা সচেতন ছিল না। এখন গ্রামের মানুষও পুষ্টি সম্পর্কে জানে। সে ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে দেশের গণমাধ্যমগুলো আরও বেশি মানুষকে সচেতন করতে পারে।

বিক্রেতার আচরণ পাল্টাতে হবে এবং সচেতন করে এবং নিরাপদ খাদ্য আইনের সংস্কার করে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। তাদের কোনোভাবে নিবন্ধিত করে মান তদারকি করা যায় কি-না ভাবতে হবে।

পরিশেষে

স্বাস্থ্যই সুস্থতা, আর সুস্থ থাকার সহজ উপায় সচেতন থাকা, আমাদের সচেতন হবার চেষ্টা করতে হবে এবং অন্যদেরও স্বাস্থ্য সচেতনতায় উৎসাহিত করতে হবে।