আপনার কিডনী দু’টো ভালো আছে তো? জানুন, সচেতন হোন এবং সুস্থ থাকুন

নাজনীন নাহার, লেখক ও সাংবাদিক ০২:০৭ মিঃ, অক্টোবর ৩, ২০১৮ Views : 490

আমার বড় মামী মারা গেছেন প্রায় দেড় বছর আগে। মারা গেছেন হাসপাতালে। তিনি আইসিইউতে ছিলেন একমাসের মত। এর মাঝে লাইফ সাপোর্টেই ছিলেন দুই সপ্তাহের বেশি সময়। শেষ দিকে আমি মামীকে দেখতে গিয়ে বাইওে কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে আসতাম। কারণ এই অবস্থায় তাকে দেখার সাহস আমার ছিল না। একদিন সাহস করে দেখে এসে সারারাত ঘুমাইনি। ভেবেছিলাম আমার মামাতো ভাইকে বলবো মামীকে লাইফ সাপোর্টে রেখে আর কষ্ট দিওনা । বলা হয়নি। তার আগে আরেকদিনও একই কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল মামীকে কষ্ট দিও না, যেদিন মামীকে ডায়ালাইসিস করা হয়। মামী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন হঠাৎ করে শুরু হওয়া বুক ব্যথা নিয়ে । চিকিৎসাধীন অবস্থায় মামীর ক্রিয়েটিনিন অনেক বেড়ে গিয়েছিল, চিকিৎসকদের উপায় ছিলনা ডায়ালাইসিস ছাড়া। কিন্তু ডায়ালাইসিস চাইলেই তো করা যায় না, রোগীর শরীরের সক্ষমতা থাকতে হয় জটিল এই চিকিৎসা নিতে। মূলত ডায়ালাইসিস হলো রক্তের বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ যন্ত্রের মাধ্যমে ছেঁকে পরিশোধিত করে বিষমুক্ত রক্ত আবার শরীরে প্রবেশ করানো। আমি মামীর ২য় ডায়ালাইসিসের দিন তার সাথে ছিলাম। মামী কষ্টে চিৎকার করছিলেন হাত দিয়ে নল খুলে ফেলতে চাচ্ছিলেন। তারা বাধ্য হয়ে মামীর হাত পা বেঁধে রেখেছিলেন খাটের সাথে। আমি তার কান্না নিতে পারিনি বেরিয়ে এসেছিলাম কাদঁতে কাদঁতে। মনে মনে বলেছিলাম আল্লাহপাক এ কষ্ট যেন কোন মানুষকে না দেন। এক একটা সেশনে ৩-৪ ঘন্টা লাগতো। মামী অবশ্য ২টা-৩টার বেশী নিতে পারেন নি । অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে মামীর কখনও কিডনী রোগ ছিলনা এবং তিনি মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। চলে যাবার বছর খানেক আগে কিডনী সমস্যা ধরা পড়েছিল কিন্তু প্র্রথম অবস্থায় ডাক্তাররা ঔষধ দিয়েই চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু

শেষ রক্ষা হলো না। পরে জেনেছিলাম মামীর কিডনীর অসুখ যখন ধরা পড়েছিল তখনই ডাক্তাররা বলেছিলেন কিডনী প্রতিস্থাপনই এর চিকিৎসা কিন্তু মামীর শারীরিক অবস্থা আর বয়স অনুকূলে না থাকায় সেই ঝুঁকি নিতে ডাক্তাররা আগ্রহী হন নি। তাই ঔষধ দিয়েছিলেন সাময়িক সুস্থতার জন্য। অথচ মামীর তেমন কোন লক্ষণও ছিল না যে আমরা সাধারণরা বুঝবো তার কিডনী রোগ হয়েছে। তাছাড়া তিনি মোটামুটি নিয়মিত ডাক্তার দেখান, তার ডায়াবেটিস বা হার্টেও সমস্যা ছিল না। কাশির সমস্যা ছিল সবসময়। তখন ভাবলাম মামীর যদি এ অবস্থা  হয় তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ বা দরিদ্র মানুষদের কি অবস্থা? তারা তো মুমূর্ষু হবার আগে হাসপাতালেই আসে না। আর খাবার দাবারের তো আজকাল যে হাল !

এভাবে দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে জটিল সব রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেছ হাজার হাজার মানুষ। রোগ শনাক্ত করার সময়টাও পাওয়া যায় না অনেক সময়। আবার শনাক্ত করা গেলেও চিকিৎসা শুরু করতে করতে প্রাণ হারায় রোগী। অনেক সময় সব ঠিক থাকলেও চিকিৎসা ব্যয় বহন করার ক্ষমতা থাকে না অনেকের । আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা পদ্ধতি হয় দীর্ঘমেয়াদী যেটা চালিয়ে যাওয়া যেমন কারো কারো জন্য কঠিন হয়ে পড়ে আবার রোগীর শারীরিক শক্তিও থাকে না চিকিৎসা গ্রহণের। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে কিডনী রোগের কথা ধরা যাক। দেশে বর্তমানে বছরে ৪০ হাজার লোক মারা যায় কিডনী রোগে। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতন লোকের সংখ্যা অনেক কম। রোগে না ভুগলে ডাক্তারের কাছে আমরা খুব একটা যাই না। ইদানীং দেখা যায় একরোগের জন্য চিকিৎসা করতে গিয়ে ধরা পড়ছে অন্যরোগের । তখন ডাক্তাররা পড়েন বিপাকে কারণ এক রোগের ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বেড়ে যেতে পারে অন্যরোগের তীব্রতা। যেমন স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি থাকা কোন রোগীর যদি কিডনী রোগ ধরা পড়ে এবং অবস্থা যদি খারাপ থাকে এবং ডায়ালাইসিস দিতে হয় তখন এই চিকিৎসা করা ডাক্তারের জন্য এবং রোগী দুইয়ের জন্য জটিল, খরচের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিডনী রোগ এক নীরব ঘাতক। স্বাভাবিক ভাবে একটু সচেতন না হলে এ রোগ ধরা পড়তে পড়তে অনেক সময় দেরী হয়ে যায়। তখন চিকিৎসা হিসাবে কিডনী প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই চিকিৎসা ব্যয় বহুল এবং জটিল। আর বেশি খারাপ অবস্থায় মানে কিডনী অকেজো হয়ে গেলে ডায়ালাইসিস ছাড়া উপায় নাই যা যথেষ্ট কষ্টকর আর ব্যয়বহুল চিকিৎসা। অথচ একটু সচেতন থাকলে আমরা এই কষ্টকর রোগ হতে নিরাপদ থাকতে পারি।

দেশে বিভিন্নব পেশায় নিয়োজিত ৫০০ জন মানুষের মধ্যে কিডনী বিষয়ক সচেতনতা সম্পর্কিত জরিপে দেখা গেছে ৫০০ জনের ৪৭% মানুষই ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত , ৪৬ % আক্রান্ত উচ্চ রক্তচাপে এবং ৩০% মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত। আর চিকিৎসকদের মতে এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের কিডনী রোগ হবার ঝুঁকি বেশি এবং জরিপের তথ্য অনুযায়ী ৯৭ % মানুষই বিশ্বাস করেন এসব রোগ কিডনী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশে বর্তমানে ৪০ হাজারেরও বেশি কিডনী রোগী থাকলেও জরিপের তথ্য অনুযায়ী ৯৬% লোকই জানে না ক্রিয়েটিনিন কি। কিডনী রোগ প্রতিরোধে ধুমপান হতে বিরত থাকা উচিত বলে মনে করেন ৯৯% মানুষ কিন্তু ৫০০ জনের মধ্যে ধূমপান কারীর সংখ্যা ৮৭% যা কিডনী রোগ হবার ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। কিডনী সুস্থ রাখার ব্যাপারে সচেতন লোকের সংখ্যা ২৫.৫%। কিডনী রোগের লক্ষণ হিসাবে ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া লোকের সংখ্যা ১১.৫% । নিয়ম করে কিডনী পরীক্ষা করান এমন লোকের সংখ্যা ৩% তাও সেটা ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ার পর। কিডনী রোগ একটি মারাত্মক রোগ এটি মানেন ১০০% মানুষ, কিন্তু এ ব্যাপারে খাবাওে সচেতন লোকের সংখ্যা মাত্র ২৩%। কিডনী রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ব্যায়াম করার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করেন ৮৭% মানুষ কিন্তু ব্যায়াম করেন ৪৭% মানুষ। কিডনী রোগ হলে এর চিকিৎসা কি এটা জানেন মাত্র ২৯% মানুষ। দীর্ঘমেয়াদী কিডনী রোগের একমাত্র চিকিৎসা ডায়ালাইসিস এটা জানেন ২৩% মানুষ। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে কিডনী রোগ ঔষধে সারে বলে বিশ্বাস করে ৪৩% মানুষ অথচ কিডনী রোগ সনাক্ত করতে করতেই কিডনীর অবস্থা হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কিডনী ট্রান্সফার করলে মানুষ ভালো হয়ে যায় বলে বিশ্বাস করে ৪৬% মানুষ। কিডনী রোগে খাবার গ্রহণে সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে ১০০% মানুষ। নিয়মিত ২-৩ লিটার পানি পান করা লোকের সংখ্যা ৪৬% আর ৩-৪ লিটার ২৪% ১-২ লিটার পানি পান করা লোকের সংখ্যা ২৫% আর ৪ লিটারের অধিক পানি পান করা লোকের সংখ্যা ৫%। দৈনিক ৬-৭ বার প্রস্রাব করা লোকের সংখ্যা ৩৪% , ৪-৫ বার প্রস্রাব করা লোকের সংখ্যা ৩৬% , ৮-৯ বার প্রস্রাব করা লোকের সংখ্যা ২০% আর এর চেয়ে অধিক প্রস্রাব করা লোকের সংখ্যা ১০%। কিডনী রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন ১০০% লোক।

সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণগুলো যদি জানা থাকে তাহলে অনেকটাই সচেতন হয়ে চলা যায় এই ভয়ানক রোগ থেকে। আসুন দেখে নিই কিডনী সমস্যার মূল কারণগুলো-

১) উচ্চ রক্তচাপ।

২) রক্তে অধিক পরিমাণ কোলেস্টেরল।

৩) ডায়াবেটিস

৪) বংশে কারও কিডনীর সমস্যাও অনেক সময় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৫) পলিসিস্টিক কিডনী ডিজিস- এই রোগের ফলে কিডনী তে সিস্ট গঠিত হয়।

৬) দীর্ঘ দিন ধরে লিথিয়াম এবং নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি (NSAIDs) ঔষধ খাওয়ার ফলেও সমস্যা তৈরী হয়।

৭) ওজন বাড়া ও ধূমপান কিডনী সমস্যার একটা অন্যতম কারণ।

৮) ষাট বা তার বেশি বয়সে অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্যা দেখা দেয়।

কিডনী মানব দেহের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি অঙ্গ, যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমাদের দেহে তৈরী হওয়া ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ সমূহ ছাঁকন প্রক্রিয়ায় প্রসাবের মাধ্যমে শরীরের বাইরে নির্গত হয়। এই কিডনী যখন অচল হয়ে পড়ে, তখন ভোগান্তির অন্ত থাকেনা। আজকাল

সমাজের প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই কেউ না কেউ এই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। কিডনী ফেইলুর বা কিডনী রোগে আজ শত শত মানুষ আক্রান্ত, কিন্তু আমরা কি জানি কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে সহজেই এই রোগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব বা এই রোগের ভোগান্তি থেকে অনেকাংশেই

মুক্তি পাওয়া সম্ভব! আসুন তাহলে জেনে নেই কিভাবে আপনার কিডনী কে সুস্থ রাখবেনঃ-

১। কর্মঠ থাকুন: নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইক্লিং করা বা সাঁতার কাটার মতো হাল্কা ব্যায়াম করে আপনার শরীরকে কর্মঠ ও সতেজ রাখুন। কর্মঠ ও সতেজ শরীরে অন্যান্য যেকোন রোগ হবার মতো কিডনী রোগ হবার ঝুঁকিও খুব কম থাকে।

 ২। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন : ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর শতকরা ৫০ জনই কিডনী রোগে আক্রান্ত হন। রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনী নষ্ট হবার ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন,নিয়মিত আপনার রক্তের সুগার পরীক্ষা করিয়ে দেখুন তা স্বাভাবিক মাত্রায় আছে কি না, না থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শুধু তাই নয় অন্তত ছয় মাস পর পর হলেও একবার আপনার কিডনী পরীক্ষা করিয়ে জেনে নিন সেটা সুস্থ আছে কিনা।

৩। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন : অনেকেরই ধারণা যে উচ্চ রক্তচাপ শুধু ব্রেইন স্ট্রোক (Stroke) আর হার্ট এটাকের   MI(Mayocardial Infarction) এর ঝুঁকি বাড়ায়, তাদের জেনে রাখা ভালো যে কিডনী ফেইলিউর হবার প্রধান কারণ হল অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ। তাই এ রোগ থেকে বাঁচতে অবশ্যই আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোন কারণে তা ১৪০/৯০ মি.মি. মার্কারী এর বেশি হলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। নিয়মিত ঔষধ সেবন এবং তদসংক্রান্ত উপদেশ মেনে চললেই সহজেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

৪।পরিমিত আহার করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন : অতিরিক্ত ওজন কিডনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তাই সুস্থ থাকতে হলে ওজন কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসতে হবে। পরিমিত স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে কিডনী রোগ হবার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। অন্য দিকে হোটেলের তেলমশলা যুক্ত খাবার, ফাস্টফুড,প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে রোগ হবার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। মানুষের দৈনিক মাত্র ১ চা চামচ লবণ খাবারে প্রয়োজন আছে।খাবারে অতিরিক্ত লবন খাওয়াও কিডনী রোগ হবার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই খাবারে অতিরিক্ত লবণ পরিহার করুন।

৫। ধূমপান পরিহার করুন: অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের কিডনী ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ গুণ বেশি। শুধু তাই নয় ধূমপানের কারণে কিডনী তে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে থাকে এবং এর ফলে কিডনীর কর্মক্ষমতাও হ্রাস পেতে শুরু করে। এভাবে ধূমপায়ী একসময় কিডনী ফেইলিউর রোগে আক্রান্ত হয়ে যায়।

৬। অপ্রয়োজনীয় ঔষধ সেবন : আমাদের মাঝে অনেকেরই বাতিক রয়েছে প্রয়োজন / অপ্রয়োজনে দোকান থেকে ঔষধ কিনে খাওয়া। এদের মধ্যে ব্যথার ঔষধ (Analgesic) রয়েছে শীর্ষ তালিকায়। জেনে রাখা ভাল যে প্রায় সব ওষুধই কিডনীর জন্য কমবেশি ক্ষতিকর আর এর মধ্যে ব্যথার ঔষধ সবার চেয়ে এগিয়ে। নিয়ম না জেনেঅপ্রয়োজনীয় ঔষধ খেয়ে আপনি হয়তো মনের অজান্তেই আপনার কিডনীকে ধ্বংস করে যাচ্ছেন -তাই যে কোন ঔষধ ব্যবহারের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন তা আপনার ক্ষতি করবে কি না।

৭। নিয়মিত কিডনী পরীক্ষা করান : আমাদের মাঝে কেউ কেউ আছেন যাদের কিডনী রোগ হবার ঝুঁকি অনেক বেশি, তাদের অবশ্যই নিয়মিত কিডনী পরীক্ষা করানো উচিত। কারো যদি ডায়াবেটিস অথবা উচ্চ রক্তচাপ থাকে, ওজন বেশি থাকে (স্থুলতা /Obesity), পরিবারের কেউ কিডনী রোগে আক্রান্ত থাকে তা হলে ধরে নিতে হবে তার কিডনী রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই এসব কারণ থাকলে অবশ্যই নিয়মিত কিডনী পরীক্ষা করাতে হবে।

 কিডনী ফেইলিউর হয়ে গেলে ভালো হয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই, ডায়ালাইসিস কিংবা প্রতিস্থাপন (Kidney Transplant) করে শুধু জীবনকে দীর্ঘায়িত করা সম্ভব। তাই এই রোগ এড়িয়ে যাবার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াটা প্রতিটি সুস্থ মানুষের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সাথে সাথে সচেতন হতে হবে খাবার গ্রহণের প্রতিও ।

 চীনের একটি প্রবাদ আছে- খাদ্যাভ্যাস থেকে রোগ। সেজন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টি বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়তয় নিত্য নতুন খাবারের উপকারী বিভিনড়ব দিক উন্মোচন করে চলেছেন। কিডনী সুরক্ষায় বিশেষ খাদ্য হিসাবে এরকম কিছু খাবারকে নিশ্চিত করেছে বিশেষজ্ঞরা।

জেনে রাখুন

  • দেশে বর্তমানে কিডনী রোগীর সংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখ
  • প্রতিবছর মারা যায় ৪০ হাজার
  • কিডনি নষ্ট হলে ডায়ালাইসিস করে চিকিৎসা করার সামর্থ্য বাংলাদেশে ১০ শতাংশেরও নেই
  • সচেতন হলে স্বল্প ব্যয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধ করা সম্ভব
  • বর্তমান ধারায় কিডনী রোগী বৃদ্ধি পেলে ২০২০ সালে বাংলাদেশে তিন কোটি ৮০ লাখ মানুষ ক্রনিক কিডনী রোগে আক্রান্ত হবে
  • বাংলাদেশে বর্তমানে দুই কোটি লোক কোন না কোন কিডনী রোগে আক্রান্ত
  • বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার রোগী ধীরগতিতে কিডনী অকেজো হয়ে প্রতিবছর অকালে মৃত্যুবরণ করে
  • অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ঔষধের ব্যবহার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কিডনী রোগের কারণ হতে পারে
  • আকস্মিক কিডনী বিকল রোগে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অনেক রোগীকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেয়

 

ক্যাপসিকাম: আপনার কিডনী সুস্থ রাখতে ক্যাপসিকাম হতে পারে প্রম পছন্দ। সালাদ এবং যে কোনো রানড়বাকে সুস্বাদু করতে এর জুড়ি নেই। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, বি৬, ফলিক এসিড এবং ফাইবার। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ এন্টিঅক্সিডেন্ট লাইকোপিন এর প্রধান উপাদান, যা কিনা ক্যান্সার প্রতিরোধেও সহায়ক।

বাঁধাকপি ও ফুলকপি: বাঁধাকপি ও ফুলকপিকে এন্টিঅক্সিডেন্ট এর খনি বললেও ভুল হবে না। এরা শরীরের ক্ষতিকারক ফ্রি রেডিকেলস এর বিরুদ্ধে কাজ করে আপনার কিডনী কে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ক্যান্সার এবং হৃদরোগ প্রতিরোধেও কাজ করে। দামে সস্তা হলেও এতে রয়েছে ভিটামিন কে, সি, বি৬, ফলিক এসিড। প্রচুর ফাইবার সমৃদ্ধ বাঁধাকপি হতে পাওে আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার অন্যতম উপাদান। ফুলকপির একটি বিশেষ গুণ হলো এটি শরীর থেকে বিভিনড়ব বিষাক্ত উপাদান দূর করতে সহায়তা করে।

রসুন: রসুনের গুণের কথা আমাদের সবারই জানা। এটি কিডনী প্রদাহ উপশম করার পাশাপাশি রক্তে কোলেস্টেরোলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিডনী রোগীদের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।

পেঁয়াজ: পেঁয়াজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ফ্লাভনয়েড, যা রক্তনালীতে চর্বি জমা প্রতিহত করে। এর এন্টিঅক্সিডেন্ট কিডনী জনিত উ”চরক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। ক্যান্সার প্রতিরোধেও এর ভূমিকা রয়েছে।

আপেল: বলা হয়ে থাকে প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে ডাক্তার থেকে দূরে থাকা যায়। নিয়মিত আপেল খাওয়ার অভ্যাস করলে তা কিডনীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও রক্তে কোলেস্টেরোল কমাতে, হৃদরোগ এবং ক্যান্সার প্রতিরোধেও এর ভূমিকা অনন্য।

লাল আঙুর: এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফ্লাভনয়েড, যা আপনার কিডনীকে রাখবে সদা তরুণ। এটি রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধেও সাহায্য করে।

ডিমের সাদা অংশ: আমরা অনেকেই স্বাস্থের কথা চিন্তা করে ডিমকে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেই। কিন্তু আপনি কি জানেন ডিমের সাদা অংশই হ”েছ বিশুদ্ধ প্রোটিন, যা আপনার কিডনীর জন্য খুবই দরকারী।

মাছ: মাছকে বলা হয়ে থাকে নিরাপদ প্রোটিনের উৎস। দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মাংসের চেয়ে মাছের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি মাছে রয়েছে ওমেগা ৩ যা কিডনী, হার্ট এবং লিভারের বিভিন্নব রোগ প্রতিরোধী। এছাড়াও কোলেস্টেরোল কমাতে এর ভূমিকা তো রয়েছেই।

অলিভ ওয়েল: গবেষণায় দেখা গেছে যেসব দেশে অন্যান্য তেলের চেয়ে অলিভ ওয়েল বা জলপাই এর তেল ব্যবহার করা হয় সেসব দেশে কিডনী রোগী, হৃদরোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি তুলনামূলক কম হয়। অলিভ ওয়েলে রয়েছে প্রচুুর পরিমাণ পলিফেনল যা এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে চমৎকার কাজ করে। রানড়বায় অথবা সালাদে অলিভ ওয়েল ব্যবহার বাড়তি স্বাদ যোগ করে।