ঘাড় ও কোমর ব্যথায় আধুনিক চিকিৎসা

ডাঃ রোখসানা আফরোজ ০৪:২০ মিঃ, অক্টোবর ৮, ২০১৮ Views : 588

মেরুদন্ড মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষাকারী অঙ্গ যা ছোট ছোট অনেকগুলো হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত। এই ছোট হাড়গুলোর প্রতিটিকে আলাদা আলাদাভাবে কশেরুকা (ভাটিব্রা) বলা হয়। প্রতি দুটি কশেরুকার মাঝে চাপ শোষণকারী চাকতি (ইন্টারভার্টেব্রাল ডিস্ক) থাকে- যা গাড়ির স্প্রিং বা শক এবজরবারের মতো কাজ করে। এটি মেরুদন্ডের এক হাড় থেকে অন্য হাড়কে আলাদা রাখে ও নড়াচড়া করতে সাহায্য

করে। এ সব হাড় কিংবা ডিস্কে কোনো ধরণের সমস্যা দেখা দিলে শরীরে বিভিনড়ব ধরণের, বিশেষ করে কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা দেখা দিতে পারে। নিচে সে বিষয়ে আলোচনা করা হলো-

ঘাড় কোমর ব্যথার কারণ :

* সাধারণত ভারী জিনিস উঠানো, আঘাত, শরীরের বিশেষ অবস্থায় ঝাঁকি খাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ডিস্কের স্থানচ্যুতি (প্রোলাপ্স) ঘটে। এর কারণে সংলগড়ব মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) অথবা স্নায়ুমূল (নার্ভরুট) অথবা উভয়ের উপরেই চাপ পড়তে পারে। কোমরের (লাম্বার) ডিস্ক প্রোল্যাপ্সে রোগী কোমর বা মাজায় তীব্র ব্যথা অনুভব করে। ফলে রোগী বসতে বা দাঁড়াতে পারে না।

 

*    কোমরে উৎপন্ন স্নায়ুসমূহ (নার্ভ) কোমর থেক পা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে মাজা ব্যথার পাশাপাশি একপাশ বা উভয় পাশের রান, হাঁটু, হাঁটুর নিচের গোছা, গোড়ালি বা পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত যে  কোন জায়গায় ব্যথা অনুভূত হতে পারে। এ ছাড়াও শরীরের এসব জায়গায় ঝিন-ঝিন, শিন-শিন করে, পায়ের বোধ শক্তি কমে যায়, পর্যায়ক্রমে পা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রোগী হাঁটতে, দাঁড়াতে এমনকি বসতেও পারে না।

*   অন্যদিকে মানুষের ঘাড়ে (সারভাইকাল) উৎপনড়ব সড়বায়ুগুলো ঘাড় থেকে হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। কাজেই ঘাড়ের ডিস্ক প্রোল্যাপ্সে প্রাথমিকপর্যায়ে ঘাড়ের ব্যথার পাশাপাশি ডান বা বাম হাত বা উভয় হাতে ব্যথা  অনুভূত হতে পারে। লাম্বার ডিস্ক প্রোল্যাপ্সের মত এখানেও হাত ঝিনঝিন, শিন-শিন করে, হাতের বোধ শক্তি কমে যায়। এক পর্যায়ে হাত দুর্বল হয়ে যেতে পারে এমনকি হাত-পা উভয়ই দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

*   বয়স্ক লোকদের মেরুদন্ডের হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যথা হয়। একে অস্টিওপরোসিস বলে। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি হয়। হাড় থেকে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে হাড় নাজুক ও ভঙ্গুর হয়ে যায়,ফলে অল্প চাপেই হাড়ে ফাটল ধরে এবং নড়াচড়ার সময় ব্যথা অনুভূত হয়।

*   অস্টিওআর্থ্রাইটিস কোমর ব্যথার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। হাড়ের জোড়ার বাতকে গেঁটে বাত বলা হয়। এটি এক ধরণের ডিজেনারেটিভ আর্থ্রাইটিস। হাড়ের মধ্যে প্রদাহ বা inflammationএর কারণে বার বার ক্ষয় ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলতে থাকলে এক সময় অস্থিসন্ধির মধ্যে থাকা কার্টিলেজ (নরম হাড়) ধ্বংস হয়, অস্থিসন্ধির মধ্যে জোড়া লেগে যায়, মেরুদন্ডের চারপাশে ছোট ছোট কাঁটার ন্যায় হাড় তৈরী হয়। ফলে মেরুদন্ডের জয়েন্টসমূহ শক্ত হয়ে যায় ও  জয়েন্টসমূহের মধ্যে নড়াচড়া ব্যাহত হয়।

*   এছাড়াও বিভিনড়ব রোগের কারণে কোমর ব্যথা হতে পারে। যেমন- অ্যাঙ্কাইলোসিং স্পন্ডাইলাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, স্পাইনাল স্টেনোসিস, স্পাইনাল কর্ড টিউমার ইত্যাদি।

ঘাড় কোমর ব্যথার চিকিৎসা :

* নিয়মিত হালকা ব্যায়াম

* ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

* রোগ নির্ণয় ও রোগের যথাযথ চিকিৎসা

* ডাক্তারের পরামর্শমত ঔষধ সেবন

* লেজার চিকিৎসা : গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, পারকিউটেনিয়াস লেজার ডিস্ক ডিকম্প্রেশনের (পিএলডিডি) মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রার ও নির্দিষ্ট ধরণের লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে অতি সহজেই নিউক্লিয়াস পালপোসাসের অংশবিশেষ বাষ্পায়িত করে এর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব। ফলে স্থানচ্যুত (প্রোলাপ্সড) ডিস্ক পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে এবং স্পাইনাল কর্ড ও নার্ভরুটের উপর থেকে চাপ কমে রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এ ছাড়া লেজারের অপটোথারমো মেকানিক্যাল স্টিমুলেশনের মাধ্যমে ছিঁড়ে যাওয়া এ্যানিউলাস ফাইব্রোসাস রিপেয়ার বা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে হাড়, মাংস ও চামড়া কাটার যেমন প্রয়োজন হয় না, তেমনি রোগীকে অজ্ঞান করারও প্রয়োজন হয় না। উনড়বত বিশ্বে ডিস্ক প্রোল্যাপ্সের বেশির ভাগ রোগীরই এখন আর কেটে অপারেশন করা হয় না। সারভাইক্যাল/লাম্বার ডিস্ক প্রোলাপ্সের বেশির ভাগ রোগীই পারকিউটেনিয়াস লেজার ডিস্ক ডিকম্প্রেশনের (পিএলডিডি) মাধ্যমে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে থাকে।

* সার্জারী

* স্টেম সেল প্রতিস্থাপনঃ ক্ষয়ে যাওয়া অংশে স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে হাড় পুনরুদ্ধার সম্ভব। এটা নিয়ে এখন গবেষণা চলছে।