এই অর্জন আমার একার নয়, আমারদেশের, আমার ছাত্র-ছাত্রীদের

নাজনীন নাহার, লেখক ও সাংবাদিক ০৫:২৮ মিঃ, অক্টোবর ৯, ২০১৮ Views : 480

ইচ্ছে ছিল বাবার মত অধ্যাপনা করার কিন্তু বাবার স্বপড়ব পূরণে ভর্তি হতে হয়েছিল মেডিকেল কলেজে। ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ডাঃ সায়েবা মেডিকেল পড়াশুনার প্রম ২ বছরে ৩ বার ব্যাগ গুছিয়ে হোস্টেলেপালিয়ে ছিলেন ডাক্তারী পড়া ভালো লাগতো না বলে। তৃতীয় বর্ষে এসে যখন রোগীদের সংস্পর্শে এলেন দেখলেন ডাক্তারদের সেবায় কিভাবে প্রাণ ফিরে পায় মানুষ-তখন হতে ভালবাসা জন্মে এই পেশার প্রতি।কে জানতো সেই তরুনী ছাত্রী একদিন জগৎ বিখ্যাত হবেন।প্রসব পরবর্তী রক্ত ক্ষরণ বন্ধ করে নারীদের জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করে ডাঃ সায়েবা আক্তার বাংলাদেশে নয় সারাবিশ্বে একটি পরিচিত নাম। প্রসব পরবর্তী রক্ত ক্ষরণ রোধে ব্যবহৃততাঁর আবিষ্কৃত চিকিৎসা পদ্ধতি সায়েবা’স মেথড নামে পরিচিত।বিভিনড়ব দেশে এই পদ্ধতি এফসিপিএস ডিসার্টেশান, এমএস থিসিস,পিএইচডি থিসিস হিসাবে পড়ানো হয়। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ইংল্যান্ডের “রয়েল কলেজ অব অবসটেট্রিক্স এন্ড গাইনীকোলজী”২০১১ সালে প্রফেসর সায়েবা আক্তার কে সম্মানসূচক ফেলোশীপ প্রদান করে। পূর্ব তৈমুর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, কেনিয়া এবংনেপাল সহ পৃথিবীতে অনেক দেশেই নারীর জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে এই মেথড। ঢাকা মেডিকেল সহ বিভিন্ন হাসপাতলে গাইনী এবং অবস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন।স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে বর্তমানে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন স্বপ্রতিষ্ঠিত মাম্স ইনিস্টটিউট ফিস্টুলা নামক হাসপাতালে সে সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত রোগী দেখা।স্বামী এবং তিন সন্তানের সংসারে সময় দিতে না পারার কষ্ট থাকলেও তা ভুলে যান মৃত্যুমূখ থেকে ফিরে আসা রোগীদের মুখ দেখে। দেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা আর মানবসেবাব্রতী এই নারী তাই আজ তার পরিবারের নয়, তিনি সে সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে গেছেন সমগ্র জাতির অহংকার আর গর্ব।আমাদের সুযোগ হয়েছিল বিদূষী ও প্রজ্ঞাময়ী এ নারীর সাথে কথা বলার, তাঁকে জানার। তাঁর সাথে আলাপচারিতায় তাঁর ব্যক্তিজীবন,পেশাগত দায়িত্ববোধ, দায়িত্বশীলতা, পরিবার, সামাজিক দায়বদ্ধতার যে বিষয় গুলো উঠে এসেছে তা নিয়েই সাজানো হয়েছে সাক্ষাৎকার এর এই পর্বটি।

চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশুনার শুরুটা কেমন ছিল?

আমার বাবা শিক্ষকতা করতেন, তাই ছোটবেলা থেকে শখ ছিল শিক্ষক হবো। কিন্তু বাবার ইচ্ছাতেই চিকিৎসা শাস্ত্রে ভর্তি হওয়া। দুবার পালিয়েও গিয়েছিলাম হল হতে,কিছুতেই ভালো লাগছিল না। তাই পাশাপাশি বন্ধুদের সাথে মিলে বিএসসি পরীক্ষাও দিয়েছিলাম, ফলাফল ভালো ছিল। মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে এসে আস্তে আস্তে ভালো লাগতে শুরু করলো। তখন একটু একটু হাসপাতালে আমাদেরকে ব্যবহারিকের জন্য নিয়ে যেত,রোগীর সংর্স্পশে আসার পর আমার ভালো লাগার শুরু।সত্যিকার অর্থে গণিতের প্রতি আমার বিশেষ দূর্বলতা ছিল। এখনো আছে, দূর্বলতা আছে অধ্যাপনার প্রতিওএবং এখন সুযোগ পেলে সেটাও করছি।

চিকিৎসা শাস্ত্রে অন্যান্য বিষয় নিয়ে না পড়ে গাইনীতে এলেন কেন, নারী বলে?

না বিষয়টি তা নয়। গাইনীতে এসেছি বন্ধুদের সাথে জেদ করে। আমার এক বন্ধু তখন বলছিল আমি গাইনীতে ভালো করবো না তাই জেদ ধরেই শুরু করি। আজ সেই বন্ধুর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তাঁর জন্যই আজ আমি এখানে এবং তৃপ্ত। চট্রগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় হতে এমবিবিএস শেষ করে এফ.সি.পি.এস করি,তবে এফ.সি.পি.এসপ্রম পর্বের সময়ই আমার বিয়ে হয়ে যায়, পরের বছরই আমার প্রম সন্তানের জন্ম হয়। তখন আমার পরীক্ষার প্রস্তুতিও চলছিল।

কেমন করে তখন ঘর সংসার, সন্তান এবং পড়াশুনা সামলেছিলেন?

আমি সত্যিকার অর্থে ভাগ্যবতী এবং পিতা মাতার আশীর্বাদপুষ্ট সন্তান। আমার পড়াশুনার ক্ষেত্রে আমার বাবার অবদান অপরিসীম। তিনি না থাকলে আজকের সায়েবার জন্ম হতো না। তারপর ভাগ্যবতী এই জন্য যে একজন মুক্তমনা সহযাত্রী হিসেবে আমি পাশে পেয়েছি আমার স্বামীকে। সে আমার চেয়ে আমাকে বেশি চেনে এবং যত্ন করে। এরপর আমার সন্তানরা যাদেরকে আমি সময় দিতে পারিনি। তারা বঞ্চিত হয়েছে মাতৃত্বের মমতা হতে, কিন্তু মেনে নিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেআমি হতে।

নব্বই দশক হতেই আপনি চিকিৎসা করছেন। নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতার সেকালএকাল নিয়ে যদি কিছু বলতেন?

সেসময়ে নারীরা নিজ স্বাস্থ্য সম্পর্কে শুধু অসচেতনই ছিলনা বরং পরিবারের নানী/দাদীর দ্বারা কুসংস্কারেও প্রভাবিত ছিল যথেষ্ঠ। আরেকটা বিষয় ছিল তথ্য স্বল্পতা। এখনও মেয়েরা অসচেতন, তরে এখন তথ্য প্রাপ্তি অনেক সহজ। মেয়েদের শিক্ষার হারও বেড়েছে কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতনতা সে হারে বাড়েনি। বরং শিক্ষিত মেয়েদেরকেই মাঝে মাঝে মনে হয় অনেক বেশি অসচেতন নিজ স্বাস্থ্যের ব্যাপারে।

সচেতনতা বৃদ্ধির উপায় কি?

এক্ষেত্রে ব্যক্তি চিন্তার বা ব্যক্তি চেষ্টার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রচার প্রচারণাও তুলনামূলক

কম। আমাদের নীতি নির্ধারক পর্যায়েও এবিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য এবং জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি পদক্ষেপ জরুরি। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের শিক্ষা কারিকুলামের দূর্বলতা। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কারিকুলামে স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কতৃর্ক গৃহীত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের মাঝে কিছুটা সচেতনতার উন্মেষ ঘটলেও তা যথেষ্ঠ নয়, যেতে হবে বহুদূর।

বর্তমানে চিকিৎসকদের দক্ষতা এবং আপনাদের সময়কার চিকিৎসকদের দক্ষতার তুলনা যদি করা হয়, তাহলে কারা এগিয়ে?

আগেও আমাদের দেশে ভালো চিকিৎসা প্রদানে রির্সোসের স্বল্পতা ছিল। এখন কমলেও আছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে আমার ভুল হতেই শিখি-ভাবি কেন এটা হলো। কি করলে এটা ঠেকানো যেত। এখনকার চিকিৎসকরাও অনেক দক্ষ তারা বিভিন্ন সোর্স হতে সহজেই অনেক কিছু জানতে পারছে। তবে চিন্তার জায়গাটা বা ভাবনার সময়টা তারা কম পায়। কিন্তু এই ভাবনার জায়গাটা খুব দরকার।

 

কোরিয়ার একজন স্বাস্থ্য কর্মী এ্যানি মুলিং এ পদ্ধতি ব্যবহার করে ৬ জন মানুষের জীবন বাঁচিয়ে রাতারাতি তারকা বনে যান। খবরটি প্রচারিত হয় বিবিসিতে। ২০১৭ সালে আগস্ট মাসে। এবং দাবী করা হয় এটা তাঁর আবিষ্কার, যেখানে ডাঃ সায়েবা এই পদ্ধতির আবিষ্কার করেন ২০০১ সালে। যদিও পরবর্তীতে এর সংশোধনী প্রয়োজন সংবাদ প্রচার করে বিবিসি।

 

সায়েবাস মেথড টা আসলে কি?

শরীরের কোথাও কেটে গেলে কাটা স্থানে চাপ দিলে যেমন রক্ত বন্ধ হয়ে যায়, কনডমকে জরায়ুতে ঢুকিয়ে ফুলিয়ে দিলে ঠিক একই পদ্ধতিতে তা জরায়ুর দেয়ালে চাপ দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করে। মাত্র তিনটি সহজলভ্য বস্তু দিয়ে এই “ইউটেরাইন বেলুন টেমপোনেড কিট” তৈরী করেন প্রফেসর সায়েবা আক্তার-একটি কনডম, একটি  ক্যাথেটার আর স্যালাইন। কনডমকে ক্যাথেটারের সাথে বেঁধে তা জরায়ুর ভিতরে প্রবেশ করিয়া দেওয়া হয়। তারপর স্যালাইন দিয়ে ফুলিয়ে দেওয়া হয় কনডম। ব্যাস-কনডমের চাপে মূহুর্তেই বন্ধ হয়ে যায় রক্তপাত। এই কিট তৈরী করতে খরচ পড়ে ১০০ টাকারও কম। এটাই সেই অভিনব আবিষ্কার যার ব্যবহারে বেঁচে গেছে লাখো প্রান। একটা সময় এই রোগে শতশত মা মারা যেতেন প্রসব পরবর্তী এই রক্তক্ষরণে। গবেষণায় দেখা গেছে শতকরা ৯৭ ভাগ ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রসব পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।

কিভাবে এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি আপনার মাথায় এলো?

আসলে আমার চিকিৎসা জীবনের শুরুতে দেখতাম অনেক ছোট ছোট মেয়েরা প্রসব ব্যথা নিয়ে হসপিটালে ভর্তি হচ্ছে এবং প্রসবের পরবর্তী রক্ত ক্ষরণে চোখের সামনেই অল্প সময়ের মধ্যে মারা যাচ্ছে। আমরা কিছুই করতে পারছিনা চেষ্টা করা ছাড়া। অনেক সময় মাকে বাঁচাতে গিয়ে ফেলে দিতে হয়েছে তার জরায়ু, ফলে তাকে মেনে নিতে হতো বন্ধ্যা হবার কষ্ট। এত রক্তক্ষরণ সে সময় আমাকে পীড়া দিচ্ছিল। সে সময় আমি মায়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করি, যেখানে ইংল্যান্ড হতে আগত একটি চিকিৎসকদল দ্বারা বেলুন ক্যাথেটারের মাধ্যমে এই চিকিৎসা করানোর বিষয়টি দেখানো হয়। এটা তখন উন্নত দেশেই ব্যবহৃত হতো এর একটার মূল্যই ছিল ৩০০ ডলার এবং আমাদের দেশে পাওয়া যেত না। সেই একটা বেলুন আমরা পরিষ্কার করে করে বহুবার ব্যবহার করেছি, যদিও সেটা ছিল একবার ব্যবহার্য। পরে সেই বেলুনটাও হারিয়ে যায়। সেদিনই দুর্ঘটনাটা ঘটে ১৮ বছরের একজন গর্ভবতী মা হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং রক্তক্ষরণেই মারা যায়। সেই রাতে আমি সারা রাত চিন্তা করি। তখন মনে পড়লো গ্রামের শিশুরা কনডমে পানি ভরিয়ে খেলা করে। তখন ভাবলাম এটা দিয়ে চেষ্টা করে দেখি তবে এর ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে জানা ছিলনা। আমি ১লিটার পানি দিয়ে দেখলাম এটা ফেটে যায় কিনা? দেখলাম না এটা ফাটছে না, তখন মনে হলো একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। সেদিন হাসপাতালে একজন রোগী এলেন- তার একটি মৃত সন্তান প্রসব হলো এবং জরায়ু ফেলে দেবার উপক্রম হলো, তখন আমি পরীক্ষামূলকভাবে এর প্রয়োগ করি এবং সফল হই। একটা সাধারণ কনডম ব্যবহারে যে এ সফলতা আসবে এটা আমিও নিশ্চিত ছিলাম না। ভয়ও ছিল অন্যান্য সহকর্মীদের কাছ থেকে কথা শোনার যেহেতু এটা আগে কখনও হয়নি।

প্রতি বছর সারা বিশ্বে ২১ কোটি নারী গর্ভবতী হন এবং ২ কোটির বেশী নারী গর্ভধারণ সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগেন। ৫ লাখের বেশী মাতৃ মৃত্যুর কারণ প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ। যত সংখ্যক মা মারা যায় তার ৩১%ই মারা যায় এই সমস্যায়।

 

 

এই আবিষ্কারের স্বীকৃতি মিললো কিভাবে?

সেটা ছিল ২০০০ সাল, আমরা যখন কনডম ব্যবহার করা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এর প্রাতিষ্ঠানিক বা চিকিৎসা পদ্ধতি হিসাবে গ্রহণযোগ্য করার জন্য কিছু পরীক্ষা নীরিক্ষার প্রয়োজন ছিল। তখন আমার সহকারী অধ্যাপক ছিল ডাঃ রাশিদা আকতার। তাঁর সাথে আলোচনা করে আমরা গবেষণা শুরু করি ২০০১ সালে। তখন এই পদ্ধতি প্রয়োগে সফল হয়েছি এমন রোগীর সংখ্যা ছিল ২৩ জন। ভেবেছিলাম ৫০ জন হবার পর পেপারটা তৈরি করে জমা দেব। আমার বন্ধু ডাঃ ফয়সালও বিষয়টা জানতো। ২০০২ সালে ডাঃ ইয়াসমিন আলী ইউনিসেফ কোকেন ডাটাবেইজে এই পদ্ধতি সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে আগ্রহী হয় এবং আমার কাছে পেপার চায়। তখন তো কম্পিউটারে সিডির ব্যবহার শুরু হয়নি। আমি ফ্লপি ডিস্কে দিয়ে দিলাম। এর মাঝে শুনি ফয়সাল বললো আপা আপনারা তাড়াতাড়ি পাবলিশ করেন, নইলে অন্য কারো নামে হয়ে যাবে। তখন আমরা মেডিকেল অনলাইনে এটা পাবলিশ করলাম। তখন ডাঃ রাশিদা খুব কষ্ট করেছিল। এর মাঝে আমি চট্টগ্রামে একটি প্রশিক্ষণ নিয়ে কথা বলতে যাই, সেখানে প্রফেসর ডাঃ তাহের খান ছিলেন, তিনি এর নামকরণ করেন এবং এই নামেই গবেষণা পত্রটি জমা দেয়া হয়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ জার্নালে এটা আবার রিভিউ হয়। ২০০৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনে এই পদ্ধতির বিষয়টির অর্ন্তভুক্ত করা হয় আমাদের রেফারেন্সসহ। বর্তমানে সারা বিশ্বেই ব্যবহৃত হচ্ছে এই পদ্ধতি।

পরবর্তীতে সারাবিশ্বে এটা কেমন করে সমাদৃত হলো?

২০০৩ সালে এটা প্রকাশিত হলে, সারাবিশ্বেই এটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে যারা মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেছিলেন। ২০০৪ সালে ব্যাংককে পিপিএইচ (postpartum hemorrhage) প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণের উপর একটি কনফারেন্সে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ পদ্ধতিটি হাতে কলমে শিখবার জন্য। সেখানে আয়োজক ছিল আইএফজিও (IFGO ।  International Federation of Gynecology and Obstetrics) ইউনিসেফ, জেপিকো, বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা সেখানে আমি এবিষয়ে কথা বলি এতে তারা খুবই অবাক এবং আগ্রহী হয়। কারণ ছিল এটি সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকরী এবং সহজলভ্য। ২০০৫ সালে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশনে প্রকাশিত জার্নাল - জার্নাল অব হবসকানি তারা এটা প্রকাশ করে। ২০০৬ সালে মালয়েশিয়ায় একটি কনফারেন্সে যাই সেখানে গিয়ে ডাঃ আগুস এর সাথে দেখা হয়। তিনি ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার ডাক্তার।তিনি জানালেন ইন্দোনেশিয়াতে মাতৃসেবায় তিনি এর প্রয়োগ নিয়ে কাজ করছেন এবং আমাকে আমন্ত্রণ জানান ইন্দোনোশিয়ায় গিয়ে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের। এরপর হতে এখনো আমি প্রতিবছরই যাচ্ছি এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে। তাছাড়া নেপাল, ভারত, তৈমুর, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশেও এই পদ্ধতির প্রশিক্ষণে গিয়েছি। এভাবেই আস্তে আস্তে সমাদৃত হয় এই পদ্ধতি। সম্প্রতি নাইজেরিয়াতে ও শুরু হয়েছে এর ব্যবহার যদিও তারা জানেনা এর আবিষ্কারক কে।

এটা ছাড়া অন্য কোন রোগ নিয়ে বিশেষ কোন কাজ আপনি করছেন কি?

আমি এটা ছাড়া প্রসব পরবর্তী ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করি। বাড়িতে সন্তান প্রসব করানোর সময় দীর্ঘ সময় প্রসব ব্যথা নিয়ে মায়েরা কষ্ট পায় এবং অনেক সময় তাদের ফিস্টুলা দেখা দেয়। এটা খুব কষ্টকর এবং এধরনের রোগীদেরকে অনেক সময় পরিবার ত্যাগ করে। ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ৭১ হাজার ফিস্টুলা রোগী আছে। তাই প্রসব পরবর্তী ফিস্টুলা চিকিৎসায় আমার আগ্রহ বাড়ে। এছাড়াও ফিস্টুলা বিষয়ে একটি হসপিটাল আছে মাম্স ইনস্টিটিউট ফিস্টুলা নামে যেখানে ফ্রি ফিস্টুলার চিকিৎসা করা হয় বিশেষ প্রসব পরবর্তী ফিস্টুলার। এক্ষেত্রে আমি সকলের সহযোগিতা পেয়েছি। আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে শুরু করি, বর্তমানে আমার পরিবার, আমার সহকর্মী, আমার ছাত্রছাত্রীরা এখানে ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে। ঢাকা মেডিকেলেও প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় ফিস্টুলা সেন্টার যখন আমি সেখানে ছিলাম। উদ্যোগ আমার হলেও খরচ সব সরকারের। আসলে ইচ্ছা যদি স্বচ্ছ হয় তবে আল্লাহ হতে সাহায্য আসে। শুরু করাটা বড়, আর তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ধরে রাখা।

 

 

আপনি নিয়মিত চিকিৎসা সেবা প্রদানের পাশাপাশি কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন- সে সম্পর্কে একটু জানতে চাই?

আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের সঙ্গে সেচ্ছায় নারী নির্যাতনমূলক কার্যক্রমগুলোর সাথে যুক্ত আছি। সারাদেশেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যার ফলে বিভিন্ন এলাকার নারীদেরকে সেবা দেবার একটা সুযোগ আমি পেয়ে যাই।

এ কাজ করতে গিয়ে আপনার যে অভিজ্ঞতা তার আলোকে যদি বলতেন যে- নারীরা কোথায় বেশী নির্যাতিত?

নারীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন তার পরিবার এবং আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে। সেটা শারীরিক এবং মানসিক দুই ভাবেই।

পরিবার ও সন্তানের কাছে ডাঃ সায়েবা কেমন?

আমার সন্তানের অভিযোগ আমার কাছে আমার পেশার গুরুত্ব সবার আগে। তারপরে আমার ছাত্র-ছাত্রী তারপর তারা। আমি মা হিসেবে ব্যর্থ কারণ তাদেরকে সময় দিতে পারিনি। পেশাগত দায়বদ্ধতার জন্য। এটা আমাকে মাঝে মাঝে কষ্ট দেয়। তবে যখন ভাবি যে আমার এই ত্যাগে অনেক প্রাণ বেঁচে যায়। তখন আর খারাপ লাগে না।

বর্তমানে সিজারে প্রসবের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে- এর জন্য কি চিকিৎসকরা দায়ী?

প্রধান কারণ ধৈর্য্যরে অভাব। এক্ষেত্রে ডাক্তারদেরও ধৈর্য্য কম, রোগীরও কম। অবাক বিষয় মা ও শাশুড়ীরও একই অবস্থা। এক্ষেত্রে একটা ধারণা যে স্বাভাবিক প্রসবে সন্তানের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। এটা একটি ভুল ধারণা। বরং তারাই বেশি সুস্থ থাকে। দেশের হাসপাতালে, ২৩% হয় সিজার ডেলিভারি। ১০০ জনে ৪৬% নারী হাসপাতালে এসে ডেলিভারি করায়। নরমাল প্রসব বাড়াতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ডাক্তার এবং রোগী দুই জনেরই ধৈর্য্যরে পরিমাণ বাড়াতে হবে। দুঃখের বিষয় যাদের সিজার দরকার তারা করাতে পারছেনা আর যাদের দরকার নাই তারাই বেশি করছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিনা প্রয়োজনে সিজারের পক্ষে না এবং আমার ছাত্রছাত্রীদের ও তাই বলি।

সায়েবাস মেথড নিয়ে আপনার আগামীর ভাবনা কি?

এই অর্জন বিশ্ব দরবারে দেশের সুনাম কুড়িয়েছে। এই আবিষ্কার আমার একার গর্ব নয়, আমার দেশের, আমার ছাত্র-ছাত্রীদের। তারাই এ মেথডকে সবার সামনে নিয়ে এসেছে গণমাধ্যমও যথেষ্ঠ সহযোগিতা করেছে বিশেষ করে বিবিসিতে সঠিক তথ্য সরবরাহে। আমি চাই এই সেবা মানুষের কল্যাণেই ব্যবহৃত হোক। তবে আমরা সারাদেশে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারিনি, এখনও ঢাকার বাইরে হেল্থ কমপ্লেক্স এর স্বাস্থ্য কর্মীরা এর ব্যবহার জানেনা। তাদেরকে প্রশিক্ষিত করতে পারলে এর ব্যবহার বাড়বে এবং মাতৃমৃত্যুর হার কমবে আশানুরূপ হারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা গেলে এ্যানজেলার মত অনেকেই অনেক মায়ের জীবন বাচাঁতে সক্ষম হবে। এর আরো প্রচার প্রয়োজন যাতে প্রাণ বাঁচে হাজারো মায়ের। এর খরচও অনেক কম। প্রচলিত পদ্ধতি খরচ ২৫০০০ এর মত আর এই পদ্ধতিতে খরচ ১০০ টাকা মাত্র। তাছাড়া আমরা ২০০০ সালে এই সেবা পদ্ধতি চালু করেছি কিন্তু পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে দেশীয়ভাবে ট্রেডমার্ক করা হলেও আর্ন্তজাতিক ভাবে না করার কারণে ইদানীং বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতিকে নিজের বলে দাবী করার সুযোগটি রয়েছে রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। সর্বোপরি আমি চাই নিরাপদ প্রসবে এই পদ্ধতির সফল প্রয়োগে মাতৃমৃত্যুর হার কমুক এবং সন্তানরা যেন মা হারা না হয়।

ধন্যবাদ