নিজের অধিকার আদায় আর নিজের সম্মান রক্ষায় নিজেকেই সোচ্চার হতে হবে সেই সাথে হতে হবে আত্ববিশ্বাসী ,সাহসী আর কৌশলী -জওশন আরা রহমান

নাজনীন নাহার, লেখক ও সাংবাদিক ০৫:৪১ মিঃ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ Views : 651

আজ আমার লেখার শব্দ ভান্ডারের বড়ই সংকট। এক অনন্যাকে জানার পরে তাকে শব্দে প্রকাশ করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় আমি বন্দী। কি করে উপস্থাপন করি তার জীবন ধারাপাতকে, যেখানে প্রতিটি ধাপ ছিল কণ্টকাকীর্ণ কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছা শক্তির কাছে ধীরে ধীরে পদদলিত হয়েছে সে কণ্টকাকীর্ণ বন্ধুর পথ। এ যেন অদম্য গতিধারা- এগিয়ে চলার, পথ তৈরী করার তেজদীপ্ততা- অনুজদের জন্য। নারী আন্দোলন নয়, নয় নারী জাগরণ -এ যেন নারীকে তার স্বরূপ চেনাবার দুর্বার অভিযান।   নদীর খরস্রোতাধারা যেমন ভাসিয়ে নিয়ে যায় সকল নুড়ি পাথর আর আবর্জনাকে, তার চলার বা এগিয়ে যাবার পথটি তেমনি খরস্রোতা, যাকে থামাতে পারেনি সমাজের কোন পংকিলতা, চিরায়ত সামাজিক অনুশাসন, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা পেশাগত সমস্যা। যে যুগে মুসলিম নারীদের সীমানা কেবল ঘর হতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গন আর বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পড়ালেখা শেষ হবার আগেই গৃহিণী সেখানে তিনি ছিলেন উল্টো রথের যাত্রী।

ব্যক্তি জীবনে পরিবেশ আর সমাজিকতায় কিশোরী বয়সেই যখন বসতে হয়েছে বিয়ের পিঁড়িতে , বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল পড়াশুনার, তখন নিজের জন্য নিজেই এসেছেন এগিয়ে, এসেছেন সুযোগ তৈরীতে, নিজেই পরিবেশ তৈরী করছেন জীবন সঙ্গীর কাছ থেকে সহযোগিতা পাবার। তখন থেকেই বিশ্বাস করতেন নিজের সমস্যা সমাধানের পথ নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়। তাই প্রথম যুদ্ধেই জয়ী হয়ে জীবনের বন্ধুত্বের বাঁধনে বাঁধতে পেরেছিলেন জীবন সঙ্গীকে। তাই তিনি পরিবার আর সংসার নামক কর্মচর্চাকে কোন দিন সমস্যা হিসাবে উপস্থাপন করার উপক্রম হতে দেননি। হয়েছেন অভিভাবক, হয়েছেন বন্ধু, হয়েছেন চলার সাথী এবং এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ। এ যেন তার প্রথম নারী বিজয়। সমাজ, পরিবার আর সংসারের জাল হতে আন্তরিক মুক্তিই কেবল নয় বরং এটাই হয়ে গেছে তার “পাওয়ার হাউস” বা সকল শক্তির উৎস। 

এভাবেই শুরু, ব্যক্তি জীবনের সমস্যা সমাধানে যেমন নিজের ধৈর্য্য, ভালোবাসা আর অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই নিজ লক্ষ্যে পৌঁছাবার পথ তৈরী করেছেন তেমনি নীতি দিয়ে, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে; সেভাবেই একের পর এক প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করে পরাস্ত করেছেন পেশাগত প্রতিবন্ধকতা আর সময় যুদ্ধকে। কি নেই সেই পথচলায়? 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান আর  ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বামী ছিলেন একজন দেশপ্রেমী, সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী, কবি এবং সাহিত্যিক জনাব মাহবুব উল আলম চৈাধুরী। তার লেখা বিখ্যাত কবিতা “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি” ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধায় লেখা প্রথম কবিতা। এমন সক্রিয় দেশপ্রেমীর জীবনসঙ্গী হিসাবে তিনিও জড়িয়ে ছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের সৈনিক হিসাবে, ছিলেন ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়, পেয়েছেন “মুক্তিযোদ্ধা” আর “ভাষা কন্যা” উপাধিও। কোথায় ছিলনা তার নারী মুক্তির আর নারী উন্নয়নের কর্মপ্রচেষ্টা! আর দশজন নারীর মত তিনি পারতেন পড়াশুনা শেষে ভালো চাকুরী করে মোটা অংকের টাকা কামিয়ে শান-শওকতে আরামে আয়েশে জীবন যাপন করতে। 

অন্তত তার পারিবারিক বংশ মর্যাদা আর পারিবারিক ঐতিহ্য সেরকমই উচ্চতর ছিল। চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়ার চুনতি গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুনসেফ পরিবারের ইতিহাস অন্তত তাই বলে। কিন্তু তিনি সাধারণের মাঝে ছিলেন অসাধারণ। পারিবারিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে নিজের আলোকিত অন্তরের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজ গ্রাম, নিজ শহর আর নিজ দেশের সর্বত্র। কখনও কখনও তা ছাড়িয়ে গিয়েছিল দেশের সীমানা। সকল কর্মকান্ডের  উদ্দেশ্যই ছিল নারী জীবনের পরিবর্তন,  নারীর ভেতরে নারীত্বকে জাগিয়ে তোলার কর্ম প্রচেষ্টা,আর এগিয়ে চলা। বৃটিশ ভারত, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলিম জাগরণ, সামাজিক বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধে নারী আন্দোলনের সবার রং দিয়েই আঁকা তার জীবনের ক্যানভাস, ছাত্র জীবনের কলেজ বন্ধু মুহাম্মদ ইউসুফের সাথে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কলেজে সাময়িকী এবং “দু’পাতা” তে। পারিবারিকভাবে তাঁর অনুপ্রেরণা ছিল মামা কামাল উদ্দিন আহম্মেদ খান, মামী সুফিয়া কামাল, সর্বোপরি স্বামী মাহবুব উল আলম চৈাধুরী। জীবনকে দেখেছিলেন ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদ, মেয়েদের জন্য দেশের মানুষের জন্য কিছু একটা করার মানসিকতা ছিল তার জীবনব্রত। তাইতো কর্মজীবন শুরুই করেছিলেন সরকারী সমাজকর্মী হিসাবে। মমতা আর মানবিকতা দিয়ে দরিদ্র মানুষের সাথে মিশে তাদের হয়ে শুনেছেন তাদের সমস্যা। পেশাগত সীমাবদ্ধতায় কখনও যদি সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিজেই তৈরী করে নিতেন সমাধানের পথ। 

সরকারী চাকুরী যতদিন করেছেন তিনি শিখেছেন কিভাবে নিজের অধিকার  আদায় করতে হয় নারী সহকর্মী হিসাবে টিকে থাকার স্বার্থে।  জানতেন কিভাবে পথ তৈরী করতে হয় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিয়ে। সম্মান অর্জন করেছেন সম্মান দিয়ে। যখন কাজ করেছেন আর্ন্তজাতিক সংস্থার প্রধান হিসাবে, তখনও দলের প্রধান হয়েও কাজ করেছেন দলের একজন হিসেবে কারণ তিনি জানতেন তিনি একজন নারী আর তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেওয়াটা তৎকালীন পুরুষসমাজের জন্য খুব স¦াভাবিক ছিল না। কিন্তু তিনি তার যোগ্যতা প্রমাণে কখনও পিছুপা হননি। 
নারী হিসেবে যখনই কোন সমস্যায় পড়েছেন তা জয় করেছেন ধৈর্য্য, সাহসিকতা আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। দাতা সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে নারী উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। বাংলাদেশে তিনি প্রথম নারী যার 
নেতৃত্বে দেশের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা করে উন্নয়নমূলক অধ্যায় সংযোজিত হয়, যার ফলাফল আজ সারা দেশের নারী ও শিশু ভোগ করছে। বর্তমানে সকল উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নারী অংশগ্রহণের যে প্রয়োজনীয়তা দেশ অনুভব করছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়ানোর কাজ করছে তার সূত্রপাত ছিল তাঁর সেই আন্দোলনের আর আন্তরিক চেষ্টার ফল। কর্ম জীবন শুরু ১৯৬০ সালে। ১৯৬০ হতে যুদ্ধ পরবর্তীতে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন সরকারী দপ্তরে। 

১৯ বছর কাজ করার পর ১৯৭৯  সালে যোগদান করেন ইউনিসেফে, কাজ করেছেন ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। দীর্ঘ ৪৩ বৎসরের কর্মজীবনের ১৭টি বছর কাজ করেছেন এই প্রতিষ্ঠানের জন্য। বর্ণাঢ্য এক কর্মজীবনে তিনি সরকারের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যথেষ্ট সংযম আর ধৈর্য্যরে সঙ্গে মোকাবেলা করেছিলেন আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিজনিত সমস্যা, অন্যদিকে ইউনিসেফের নতুন নতুন নিয়ম কানুন মেনে প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব। এ সময়ে কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষ বৈষম্য ছিল উল্লেখ করার মত। কম সংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ তাকে মানসিকভাবে আহত করতো । কিন্তু যেখানেই তিনি  বৈষম্যের শিকার হয়েছেন সরে দাঁড়াননি পথ ছেড়ে বরং মোকাবেলায় ছিলেন প্রতিবাদী এবং সাহসী।  কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছেন নিজেকে বার বার। তার হাতেই প্রথম ফান্ড দেয়া হয়  ড. মুহাম্মদ ইউনুসের গ্রামীন ব্যাংক প্রকল্পকে। তিনি তখন ইউনিসেফের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তার বিশ্বাস ছিল কলেজ বন্ধুর উপর। দূরদর্শী এই জয়িতার জীবন কাব্য আজকাল যেকোন নারীর জন্য শিক্ষণীয় আর অনুকরণীয়।

“আমার স্বাস্থ্য” জার্নালের সুযোগ হয়েছিল এই অসাধারণ প্রজ্ঞাময় অদম্য মানুষটিকে কাছ থেকে শোনার এবং জানার। তার জীবনকাব্য যেকোন নারীর জন্য পথনির্দেশক বিশেষ করে যারা সত্যি কিছু করতে চায়, বদলাতে চায় সময়কে সবার জন্য । তাঁর অভিজ্ঞতা, কর্মময় জীবন আর অর্জন আজ দেশের গর্ব। এই অসাধারণ মানুষটির সাধারণ কিছু কথা নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন “তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’’- কলমে কালিতে ছিলেন নাজনীন নাহার।

আপনার জন্ম এবং শৈশব কোথায় কেটেছে?

চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার চুনতী গ্রামে মুনসেফ বাড়ীতে জন্ম আমার, আমার দাদা সিদ্দিকুর রহমান ছিলেন  একজন নামকরা কাজী। প্রপিতামহ শুকুর আলী মুনসেফের দেশজোড়া খ্যাতি ছিল। আমাদের বাড়ী যাবার রাস্তার নাম করা হয় তার নামে। শুকুর আলী মুনসেফ লেইন। 

অপর দিকে আমার নানা তৈয়ব খান ছিলেন জমিদার এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমার মায়ের দাদা ছিলেন খান বাহাদুর নাসির উদ্দিন, তৎকালীন সময়ের জনপ্রিয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। আমার বাবা মাহবুবুর রহমান ছিলেন সরকারী চাকুরে। নানার দিক দাদার দিক উভয়দিক হতেই আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য এবং পারিবারিক অনুশাসনের মাঝেই আমার বেড়ে উঠা। আব্বা ছিলেন একজন নীরব সমাজকর্মী। অনেক দরিদ্র ছাত্রছাত্রীকে পড়াশুনা করিয়েছেন, সে সাথে তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল মানুষ তাই ছোটবেলা পড়াশুনার পাশাপাশি বইপড়া, গানশোনা, গান গাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহ পেয়েছি বাবার কাজ হতেই। 

আমার মা আমাদের পড়াশুনা, আদব কায়দা শেখানো, রান্নাবান্না নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। সময় পেলে বই পড়তেন। আমার মামা কামাল উদ্দিন আহমেদ (কবি সুফিয়া কামালের স্বামী) কলকাতা হতে মায়ের জন্য পত্রপত্রিকা নিয়ে আসতেন। মা সাহিত্য অনুরাগী ছিলেন। মা কোনদিন কাজের লোকদের নাম ধরে ডাকতেন না। আমাদেরকে ডাকতে দিতেন না। বুবু, দিদি, আপা ইত্যাদি ভাবে সম্বোধন করা হতো তাদের। কাজের লোকেরাও মানুষ আর মানুষকে মানুষ ভাবতে পারার কাজটা মা আমাদের শিখিয়েছেন। আব্বা ভোরবেলা নামাজ পড়ে ইংরেজীতে তরজমা সহ সুর করে কুরআন পড়তেন। 
বাসায় ধর্মচর্চা ছিল, তবে ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না । আমাদের বাবা সৎ ছিলেন। সম্পদের বিবরণে বলতেন আমাদের ৮ ভাইবোনই তার ৮ অট্টালিকা। সময় সামাজিকতায় বড় আপার তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে গেলেও আমার বাকী ৭ সাত ভাইবোনকে বাবা মা পড়াশুনা শিখিয়েছেন। পারিবারিকভাবে শিক্ষা, সাহিত্য, দেশপ্রেম, মানবতা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ের ইতিবাচক পরিচর্যার মাধ্যমেই আমার শৈশবে বেড়ে উঠা। ১৯৫০ সালে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে কৃষি শিল্প ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমি ও ফেরদৌসি রহমান একসাথেই গান করেছি। তিনি তখন ছোট বালিকা। আমি ছোট বেলায় খুব জেদি আর স্পর্শকাতর ছিলাম। মা বলতেন মিলিটারি মেজাজ!

পড়াশোনার শুরুটা হয়েছিল কিভাবে?

আমার প্রাথমিক শিক্ষার শুরু হয় “গুল এ জার স্কুলে”। ছোট বেলায় আমি ভীতু ছিলাম, সব সময় আমার ছোট বোনের সাথে সাথে থাকতাম। মাঝে মাঝে স্কুলে কাঁদতাম। বড় বোনের কান্না দেখে আমার ছোট বোন বিব্রত অবস্থায় পড়ে যেতো । পঞ্চম শ্রেণিতে এসে ভর্তি হলাম কুসুম কুমারী বালিকা বিদ্যালয়ে। কুসুম কুমারী আমৃত্যু এই স্কুলের প্রবীন শিক্ষিকা হিসাবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এই স্কুলে তখন মুসলিম মেয়ের সংখ্যা হাতে গোনা। ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে আমি আবার “গুল এ জার স্কুলে” চলে আসি। এই সময়গুলো ছিল বেশ আনন্দের, কলকাতা হতে তখন অনেকে এসে চট্টগ্রামে পড়তো। পাকিস্তান, কলকাতা তখন সব একত্রিত ছিল। দুরত্ব ছিল কেবল রাস্তার। তাই সুযোগ হয়েছিল ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ধর্মের কায়দা কানুন পালনের সংস্পর্শে আসার। সে সময় চট্রগ্রাম খাস্তগীর স্কুল ছিল নামকরা স্কুল এবং ভর্তি হওয়াও কঠিন ছিল। চরম প্রতিযোগিতা এবং আমার মেজো ভাই লুৎফর রহমানের আন্তরিক চেষ্টায় আমি খাস্তগীর বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হই। এখানে মুসলিম মেয়ের সংখ্যা ছিল খুবই কম। খাস্তগীর স্কুলে দশম শ্রেণীতে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি আমরা ১৪ জন ছাত্রী। এই ১৪ জনের ১৩জনই পরবর্তীতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক হয়েছি। আমি লেখাপড়ায় অত্যন্ত সাধারণ ছিলাম। 

তবে কঠোর পরিশ্রম করে মেধাকে খাটিয়ে যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় তা আমার জীবনে বার বার অনুভব করেছি। মেট্রিক পরিক্ষায় প্রথম বিভাগে স্কলারশীপ নিয়ে পাস করেছিলাম খাস্তগীর স্কুল হতে ১৯৫২ সালে। যদিও পরীক্ষার আগেই আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।

তাহলে বিয়ে আর আপনার পড়াশুনার মাঝের সম্পর্কটা কিভাবে সামলেছিলেন?

মেট্রিক পরীক্ষার দু’মাস আগে আমি খাস্তগীর স্কুলের হোস্টেলে ছিলাম। বাসায় মেঝ ভাইয়ের বিয়ে, আত্বীয়স্বজনদের আসা যাওয়া, বাসা ভর্তি লোকজন- তাই পড়াশোনার জন্য হোস্টেলে থাকা। হোস্টেলের জীবনটা ছিল বেশ আনন্দের,পড়াশোনার ব্যস্ততার পাশাপাশি, মেট্রনের নজরদারি। এর মাঝে হঠাৎ একদিন ছোট বোন জুবলী আমাকে নিতে এলো মেঝ ভাইয়ের আদেশে।

বাড়ী এসে রাতে খাবারের পর মেঝ ভাইয়ার রুমে ডাক পড়লো। ভাবলাম হোস্টেল হতে হয়তো বাসায় নিয়ে আসার ব্যাপারে কথা বলবে। কারণ সেখানে মাসের খরচটা কম ছিল না। কিন্তু বিষয়টি ছিল ভাবনার বাইরে। ভাইয়া জানালেন আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। তিনি আমাকে বিয়ে দিতে চান। এর আগে ৮ম শ্রেণীতে থাকতে ভাইয়া তার এক ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে একবার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তখন বাল্য বিবাহ স্বাভাবিক, তবে আমাদের পরিবারে মেয়েদের মত না নিয়ে বিয়ে দেওয়া হতো না। ছোট বেলা হতে উচ্চ শিক্ষার জন্য আমার সুদৃঢ় বাসনা। বড় হবার ইচ্ছা, তাছাড়া কম বয়সে লেখাপড়া শেষ না করে আমার বিয়ে হবে এ কথা কোন দিন ভাবতে পারতাম না। বোধ করি এই দুর্বার মনোভাব নিয়ে আমি এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলাম। লিখিতভাবে ভাইয়াকে জানিয়েছিলাম লেখাপড়া আগে শেষ হোক তার পর দেখা যাবে। এ ঘটনার পর আমাকে আর কেউ বিয়ে দিতে চাইবে না এই প্রত্যাশায় পড়ালেখায় মনোনিবেশ করেছিলাম। বিধি বাম, মেজ ভাই এরপরই আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে আসলেন। 

পাত্র একজন সাহিত্যিক, চট্টগ্রামের নামকরা পরিবারের ছেলে। ভাইয়া বুঝালেন তার সাথে বিয়ে হলে আমার উচ্চ শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন পূরণ সহজ হবে। পাত্র চট্টগ্রামে সীমান্ত পত্রিকার সম্পাদক মাহবুব উল আলম চৌধুরী । 

তিনি তখন খ্যাতির শীর্ষে রাজনীতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকার জন্য তিনি প্রগতিশীল মহলে সর্বত্র প্রশংসিত। সেই মানুষকে আমার পরিণয় প্রার্থী হিসাবে ভেবে একটু গর্ববোধ হলো। কিন্ত আমার উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবল ইচ্ছার কাছে এই বিয়ে বিঘ্ন ঘটাবে ভাবনায় প্রত্যাখান করলাম। মেঝ ভাই বললেন সারারাত ভাবো। সময় নাও তারপর বল, সাথে বললেন অন্য কারো সাথে বিয়ে হলে সুগৃহিণী হয়তো হতে পারবি কিন্তু একজন সংস্কৃতিবান মানুষকে নিত্য সহচর হিসাবে নাও পেতে পারিস। 
আমি রাগে দুঃখে ক্ষোভে সারারাত কাঁদলাম, খাবার বন্ধ। কিন্তু আবার ভাবছিলাম সামনে পরীক্ষা, অনেক ভাবনা চিন্তার পর মনে শক্তি সঞ্চয় করে স্থির করলাম বিয়েতে মত দিব তবে শর্ত থাকবে আমাকে এম.এ পর্যন্ত পড়তে দিতে হবে। এরপর প্রথম দেখা ভাইকে সাথে নিয়ে। বলতে বাধা নাই মাহবুব সুদশর্ন আকর্ষনীয়, প্রথম দেখায় বলেছিল- আমি রাজনীতি করি। আমার বিরুদ্ধে হুলিয়া বের হতে পারে, এসব জেনে আমি বিয়েতে রাজী কি না, সে সত্যবাদী মানুষ, আজ এতকাল পর বলি আমি সেদিনের সিদ্ধান্ত যদি না নিতে পারতাম এমন বন্ধুর মত স্বামী, অভিভাবকের মত পথ প্রদর্শক, আর পরামর্শ দাতা স্বামী পেতাম না, সে আমার সকল অর্জনের অংশীদার আর অনুপ্রেরণা ও সহযোদ্ধা, প্রথম দেখার পর হতে তার প্রেমে পড়েছি বলতে পারি, জীবনের প্রতিটি পর্বে তার সাহচর্য, প্রীতি, ভালবাসা, মমতা ও অনুপ্রেরণা পেয়েছি ।
তার রাজনীতি আর দেশপ্রেমের পরিচয় পেলাম বিয়ের ক’দিন আগেই। 

২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে রাতে খবর পেলাম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ অফিসে কর্মরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়ে, সে তখন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের চট্টগ্রাম শাখা আহবায়ক। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি “কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি” কবিতাটি রচনা করেন। এ কবিতাটি ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত প্রথম কবিতা হিসেবে 
স্বীকৃত। 
এর কিছুদিন পর আমাদের বিয়ে হয়ে গেল জাঁকজমকভাবে। কিন্তু তার সাথে আমার সংসার শুরুর  দিকেই আমি আমার পড়াশুনার কথা জানিয়েছিলাম। সুতরাং সহযোগিতা পেয়েছিলাম শুরু হতেই।

১৯৬০ সালে আপনার কর্মজীবনের শুরু। কেমন ছিল শুরুটা? কিভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন একজন সমাজকর্মী হিসাবে, কারণ মেয়েদের তখন এসব কাজ খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল?

আমার বয়স তখন ২৪ এবং আমি এক কন্যা সন্তানের জননী । আমার স্বামী আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় বেশীর ভাগ সময়ই তাকে আত্নগোপন করে থাকতে হতো । মেয়ে আর সংসার- দুইই আমার একা সামলাতে হতো। পাশাপাশি স্বামী ধরা পড়ে জেলে যাবার আতঙ্ক ছিল সর্বদা। এমন পরিস্থিতিতেও আমার পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছি, পেরেছিলাম কারণ আমার স্বামী আমাকে সে সাহস যুুগিয়েছে , শিখিয়ে দিয়েছিল মেয়েদের কিভাবে পথ চলতে হয় একা। চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ হতে ১৯৫৮ সালে স্নাতক শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করি ১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে।  তখন আমি বি.এ পাশ করেছি, বি.এ পাশ মেয়ে তখন অনেক কম ছিল। 

আমার কোন চাকরি খুঁজতে হয় নাই। আমাকে খুঁজে নিয়ে চাকরী দিয়েছে। সবগুলো চাকরি-ই আমার এমন। কি রকম চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করেছি। ছোট একটা অফিস। কর্মজীবনে পুরুষ সহকর্মীই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কর্মক্ষেত্র শুরু হয়েছিল সমাজ কল্যাণ অফিসার হিসাবে। কর্মস্থল ছিল চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের নীচতলা। কিছুই জানতাম না।  ছোট্ট একটা অফিস ছিল। গভর্নমেন্ট বলেছে আমরা কোন সম্পদ দেব না। স্যোশাল ওয়ার্ক স্যোশাল ওয়ার্কের মতই হবে। তোমরা নিজেদের রাষ্ট্রের আর সমাজের সম্পদ ব্যবহার করে কাজ করবে, যেখানে উন্নতি করা যায় করবে। কোন টাকাও দেয় নি। 

মিউনিসিপ্যালটিকে বলে ছোট্ট একটা অফিস ম্যানেজ করেছি। ছোট্ট একটা রুম দিয়েছে মিউনিসিপ্যালটি। দুইটা চেয়ার ছিল, অফিসার দুইজন ছিল বলে আর একটা বেঞ্চ ছিল ওয়ার্কারদের বসার জন্য। আমি যখন জয়েন করেছি আমি ছিলাম দ্য থার্ড ওয়ান। নিয়োগের ক্ষেত্রে পুরুষদেরই প্রাধান্য ছিল। চেয়ার ছিল দুইটা, বসার জায়গা ছিল না। টেবিলও ছোট, ব্যাগ রাখার জায়গা হত না। তো আমি দাঁড়িয়ে কাজ করতাম ব্যাগ কাঁধে নিয়ে। পুরুষ সহকর্মীরা কেউ কোনদিন বসার জন্য অফার করেনি। আমার খুব মন খারাপ হত। বাসায় এসে কোন কোন দিন কাঁদতাম। আমার স্বামীকে বলতাম। ও খুব সাপোর্ট দিত। ও সাপোর্ট না দিলে কিছু করতে পারতাম না। ও আমাকে বুঝাতো যে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদেরকে দ্বিগুন প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করতে হয়। অনেক ধৈর্য্য ধরতে হয়। 

এভাবে আমার প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। এটাই শিক্ষা আর সবাইকে বলার যে কিভাবে একজন নারী তার পারিবারিক এবং পেশাগত সমস্যার মোকাবেলা করবে, কোন পন্থা অবলম্বন করলে পেশাগত সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা করা সহজ হবে, কিভাবে চিন্তা করবে, কিভাবে বৈরী পরিবেশে সহকর্মীদের সাথে সমঝোতা করে কাজ  করতে হয়। যেভাবে আমি আস্তে আস্তে ওদেরকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে শুরু করলাম এবং আস্তে আস্তে চেয়ার দখল করেছি। আধা ঘণ্টা আগে চলে যেতাম। তো একজন দাঁড়িয়ে থাকতো কিন্তু আমাকে তো উঠিয়ে দিতে পারে না। এভাবে নিজের অধিকার নিজে আদায় করলাম। 

এটাও একটা শিক্ষা যে নিজের অধিকার নিজের আদায় করতে হবে। নিজের অস্তিত্বকে নিজেই বজায় রাখতে হবে। এর জন্য দরকার আত্মবিশ্বাস, অধ্যাবসায় এবং ধৈর্য্য। এভাবেই কর্মজীবনে যোগ্যতা প্রমাণের শুরু। কাজ করতে হয়েছে বস্তির সুইপারদের সাথে। বস্তিতে গিয়ে মিশতে হতো ওদের সাথে , শুনতে হতো ওদের কথা, অনেক সময় খেতে হতো ওদের দেওয়া খাবার। সমস্যা হয়নি আমার, আমি বিশ্বাস করি মানুষকে মানুষই ভাবতে হয়। সহকর্মীদের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের প্রতি শ্রদ্বা দেখিয়েই অর্জন করতে হয়েছে নিজের যোগ্য অবস্থান।

সন্তান আর সংসার; সেই সাথে কর্মজীবন কেমন করে ভারসাম্য রেখেছিলেন সব কিছুর?

আমার পেশায় আমি সবসময় সৎ থাকার চেষ্টা করতাম নিষ্ঠার কমতি হয়নি কখনও। কিন্তু কতটা পেরেছি জানি না তবে চেষ্টার ত্রুটি ছিলনা। তাই বলে সন্তান আর পেশার মাঝে যে সংঘাত হয়নি তা নয়। কোনটাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিত? এই প্রশ্নের মুখোমুখি অনেকেরই হতে হয় কর্ম জীবনে। আবার এই দুইয়ের মাঝে সামঞ্জস্য টেনে পথ চলা বেশ কঠিন ছিল। কোন কারণে যখনই মনে হয়েছিল আমি আমার শিশুকে অবহেলা করেছি তখন থেকেই আমি ও মাহবুব আমার মেয়ের প্রতি সচেতনভাবে যত্নবান হতে শুরু করলাম। 

এই ব্যাপারে আমরা প্রায়ই আলোচনা করতাম। মা-বাবার প্রাত্যহিক আদর-যত্ন-স্নেহ-ভালবাসা থেকে আমার শিশুকে বঞ্চিত করার অধিকার আমাদের নেই। তার বাবা আমার শূণ্যস্থান পূরণ করার লক্ষ্যে মেয়ের প্রতি আরো বেশি যত্নবান হয়ে উঠলো। কিন্তু শিশুর জন্য মা ও বাবা উভয়ের ভূমিকাই তো গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরের পরিপূরক। শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য আরো প্রয়োজন মা-বাবার মধ্যে বন্ধুসুলভ ব্যবহার। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক 
থাকলে পরিবারের যে কোন সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব। এভাবে সমঝোতার মাধ্যমে আমরা জীবনে অনেক কঠিন সময় উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছি।

আপনার সংসার জীবন কেমন ছিল?

আমরা আর্দশ দম্পতি ছিলাম, একথা আমি বলবো না। তবে দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক বরাবরই ছিল। আমাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, দ্বিমত পোষণ ইত্যাদি হতো। সাংসারিক বিষয়ে, আমরা আত্বীয়স্বজনদের  রাজনৈতিক আর্দশ নিয়ে, এমনকি টাকা পয়সা ব্যয় সম্পর্কেও অনেক সময় ঝগড়া-বিবাদ হতো। তবে একথা সত্যি যে যতদিন আমি লেখাপড়া শিখে জ্ঞান অর্জন করতে পারিনি এবং নিজে রোজগার করতে পারিনি, ততদিন আমার আত্বশক্তির ভিত ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সাহস করে মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারতাম না। নিজে শক্তি সঞ্চয় করে যখন যুক্তিপূর্ণ কথা বলা শুরু করলাম, তখন মনোযোগ সহকারে তা শোনার জন্য মাহবুবের চেষ্টার অন্ত থাকতো না। 

আপনি সরকারী বেসরকারী সহ বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, পরিবেশ ভেদে নারী পুরুষের বৈষম্য কেমন ছিল?

আমার কর্মজীবনের শুরুর কথা তো আগেই বলেছি। মেয়েদের অংশগ্রহণ কম ছিল, সাথে ছিল মেয়েরা তুলনামূলক ভাবে অদক্ষ এটা প্রমাণের প্রচেষ্টা । বড় বড় কাজ বা নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে মেয়েদের মূল্যায়ন যথাযথ ছিলনা। এটা সরকারী বেসরকারী উভয় ক্ষেত্রেই  সমান। কাজের ক্ষেত্রে আমরা মনে করি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে এ বৈষম্য নাই। ওখানেও গিয়ে দেখলাম অনেক বৈষম্য আছে। পার্থক্য ছিল কেবল পরিবেশের তবে  আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করা যতটা সহজ সরকারীভাবে ততটা সহজ নয়। 

তবে আমরা মেয়েরা তখন যেখানে কাজ করেছি একে অন্যকে সাহায্য করেছি আন্তরিকতার সাথে । তবে বৈষম্য ছিল। বর্তমানে কমছে কারণ মেয়েরা শিক্ষিত হয়েছে কাজ করছে কিন্তু তারপরও বৈষম্য থাকবে হয়তো ভিন্নরূপে ।
কারণ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের খুব একটা পরিবর্তন এখনও সাধিত হয়নি।  তাই  প্রয়োজন বৈষম্য  মোকাবেলা করার শক্তি অর্জন। ব্যক্তিগতভাবে আমি সরকারের সংগে কাজ করতে গিয়ে যথেষ্ট সংযম আর ধৈর্য্যরে সংগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মোকাবেলা করেছি, অন্যদিকে ইউনিসেফে যাওয়ার পর  নতুন নতুন নিয়ম কানুন মেনে প্রকল্প পরিচালনার দায়িত¦ পালন করাও ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। 

নারী কর্মকতার অধীনে কাজ করার মানসিকতা তখন অনেকের ছিল না। কিন্তু সহকর্মীর সহযোগিতা ছাড়া একটা টিমওর্য়াক ছাড়া লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। আর দলের ছেলেরা তো চাইতোই মেয়ে হিসাবে আমার ব্যর্থতা প্রমাণের। এজন্য আমি সবসময় তাদেরকে নিয়েই কাজ করতে চাইতাম। তাদেরকে সম্মান দিয়েই নিজের সম্মান আদায় করে নিয়েছি। নিজের কাজ আর দক্ষতা আর মানবিকতা দিয়ে দলের প্রধান না হয়ে কাজ করেছি দলের একজন হিসাবে। এই বিষয়গুলোর চর্চা দিয়ে আমি সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করেছি। যে কাজ করতে দেয়া হতো না মেয়ে বলে সেটাই করে প্রমাণ করতাম মেয়েরাও পারে। কারণ আমি কেবল আমার জন্য ভাবতাম না ভাবতাম আমি না করলে আরেকটা মেয়ে কেমন করে এখানে আসবে অর্থাৎ পথ তৈরী করা। সে সময় আমরা যারা বিভিন্ন পেশায় কাজ করতাম তারা একে অপরের পাশে ছিলাম সহযোগী হিসাবে।

আপনাদের কাজ করার সময়টা আর এখন কাজ করার সময়টা ভিন্ন। আপনারা যেমন আন্তরিকতা আর দৃঢ়তা দিয়ে সমস্যাগুলোকে উতরে গেছেন সেই অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

এখনকার নারীরা অনেক এগিয়ে গেছে। এই এগিয়ে যাওয়ার পেছনে আছে সেসব নারীদের ভূমিকা যারা সামাজিক পারিবারিক  এবং পেশাগত প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং সাহস জুগিয়েছেন অন্য নারীদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য। ১৯৬০ থেকে  আমরা নারীরা যেভাবে প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবেলা করে আসছিলাম তাতে করে একটু একটু করে মেয়েদের জন্য সুযোগ তৈরী হয়েছে আর আমরা শিখেছি কাজের প্রত্যেকটা স্তরে। কর্মজীবনে আমি নারীদের উন্নয়নেই বেশী কাজ করেছি। তাদের আর্থিক স্বাধীনতাই তাদেরকে এগিয়ে যেতে পারবে এ বিশ^াস হতেই আমি ইউনিসেফে কর্মরত অবস্থায় কাজ করেছি ড. মুহম¥দ ইউনুসের গ্রামীন ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋন প্রকল্পের সাথে। আজ এই প্রকল্পের সফলতায় গ্রামের হাজারো নারী আত্মনির্ভরশীল।

যতদিন সরকারী চাকুরী করেছি চেষ্টা করেছি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করার । পরে ইউনিসেফের হয়ে কাজ করেছি উইমেন’স ডেভেলপমেন্ট, জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট , নারীর সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে। সম্ভবত ১৯৮৭ সাল, তখন ইউনিসেফের ১৯৮৫-১৯৮৮ সালের তিন বছর মেয়াদী কান্ট্রি প্রোগ্রাম চলছে এবং নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কান্ট্রি প্রোগ্রাম (১৯৮৮-১৯৯৩) সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমাদের উইমেন’স ডেভেলপমেন্ট ইউনিটের তরফ থেকে বাংলাদেশের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারী উন্নয়নকে কিভাবে শক্তিশালী করা যায়, এসব নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছিলাম অনেকদিন ধরে। 

নারীকে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে হলে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্থান পেতে হবে। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে এককভাবে পা না বাড়িয়ে দাতাগোষ্ঠী হিসেবে আমরা একজোটে কিছু করতে পারি কি না তা আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলাম। ইউনিসেফের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত উল্লেখিত মিটিংয়ে আমি প্রস্তাব করলাম, চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারী উন্নয়ন বিষয়ে ম্যাক্রো অধ্যায় সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে আমরা দাতাগোষ্ঠীর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি।

এতে কেউ অকুণ্ঠ সমর্থন জানালো। আর কেউ নেতিবাচক কথা বলল। আবার কেউ ঠাট্টার সুরে নানা মন্তব্য করল। ড্যানিডার শিরীন হক এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সুজান ডেভিস আমাকে বিশেষভাবে উৎসাহ দিল। বিশ^ ব্যাংকের ওয়াহিদা হক বললো, দাতাসংস্থার তরফ থেকে দেশের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ম্যাক্রো চ্যাপ্টার সংযোজনের জন্য কাজ করা আপনার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্য যুক্তিগ্রাহ্য। আমরা দাতা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে প্রত্যক্ষভাবে এ কাজ করতে পারি না। কিন্তু এতে নিরাশ না হয়ে বললাম, আমার সাড়ে আঠারো বছরের সরকারি চাকরি এবং ইউনিসেফে আট বছরের (তখন পর্যন্ত) অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিভাবে এগুতে হবে তা আমার অজানা নয়। 

সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে সামনে রেখে এবং পশ্চাদ থেকে কাজ করে কিভাবে তাদেরকে শক্তিশালী করতে হয়, সে কৌশলও আমার অজানা নয়। সকলের সমর্থন এবং সহায়তা পেলে আমরা অবশ্যই জয়ী হব।আমি এই কাজকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলাম। শত বাধা-বিপত্তি সত্তে¡ও নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি প্রায়ই সফল হয়েছি। নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে এবং আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি সরকারী যে কোনো সংস্থা আমাকে সহযোগিতা করছে। এই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি কোনো দিন আত্মবিশ্বাস 
 হারাইনি। আমার এই আত্মবিশ্বাস এবং কমিটমেন্টই সবসময় আমাকে পথ নির্দেশনা দিয়েছে।

পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীকে উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উপায় ও কৌশল খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় লেগে গেলাম। এর মধ্যে অনেক সময় গড়িয়ে গেল। ইউনিসেফের ১৯৮৮-১৯৯৩ কান্ট্রি প্রোগ্রাম হয়ে গেল। Advocacy, Awareness and Strengthening of Information Base for Women in Development (AASIB)  প্রজেক্টের আওতায় এই কাজের জন্য কিছু অর্থ বরাদ্দ করে রাখলাম। এর বাস্তবায়ন সংস্থা ছিল মহিলা বিষয়ক পরিদপ্তর, তখনো অধিদপ্তরে উন্নীত হয় নি। 

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যের মধ্যে চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারী-উন্নয়ন বিষয়ক ম্যাক্রো অধ্যায় সম্পর্কিত কাজ করার জন্য একটি কর্মসূচী অন্তর্ভুক্ত করলাম। ৪র্থ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নারী উন্নয়ন অধ্যায়টা সংযোজনের উদ্দেশ্য ছিল নারী উন্নয়ন বিষয়টিকে মূল ধারার সাথে সংযোজিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে আমি  বিশ^ব্যাংক সহ সকল দাতা সংস্থাকে বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা বুঝাবার চেষ্ঠা করেছি এবং তাদের সহযোগিতায় বিষয়টি প্রস্তাবনা আকারে সরকারের কাছে উপস্থাপনা করি। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা এবং নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের (তখন বলা হতো নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয়) সাথে কাজ করেছি দীর্ঘদিন। অনেকে আমাকে ঠাট্টাও  করেছে, বলেছে এ হবার নয় সরকারী কাজ , আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদি। আমি বলেছি দেখি না করে কি হয়। থেমে যাই নি কিন্তু। থেমে যাই নি কারণ আমার সরকারী কাজের অভিজ্ঞতা আছে। আমি জানতাম কিভাবে কাজটা করিয়ে আনতে হয়, কার কাছে যেতে হয়, একটা টেবিল এ কতবার যেতে হয়। আমি ইউনিসেফ এ উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা  ছিলাম। প্রথমে উইমেন্স ডেভেলপমেন্ট এর প্রধান ছিলাম পরে প্রোগ্রাম প্ল্যানিং সেকশন এরও প্রধান ছিলাম। 

সেটা হয়েও আমি প্ল্যানিং কমিশন এ তারপর উইমেন্স অ্যাফেয়ারস মন্ত্রণালয় সহ আরও অনেক মন্ত্রণালয়ের কেরানীদের যাদেরকে এখন এ্যাসিসট্যান্ট বা সেক্রেটারি বলে  ওদের কাছে অনেকবার গিয়েছি, গিয়েছি টাইপিস্ট এর কাছে কতবার । টাইপিস্ট এর কাছে বসে বসে ডিকটেশন দিয়েছি তা না হলে ওরা লিখবে না ৫/১০/১৫ দিন দেরি করবে। ওরা ভেবেছে ওরে বাবা এত বড় অফিসার আমাদের কাছে এত বার এসেছে আমরা কাজটা তাড়াতাড়ি করে দেই। এটাই ছিল আমার নিজস্ব কর্মপন্থা। এভাবেই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সংযুক্ত হয় নারী উন্নয়নের বিষয়টি । 

একইভাবে আন্দোলনের মাধ্যমেই পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় শিশুদের অধিকার অধ্যায়টা সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। এগুলো আর বন্ধ হবে না। হয়ত উইমেন’স ডেভেলপমেন্ট হিসেবে থাকবে না যার কারণ হল প্রথমে দেয়া হয়েছিল ফোকাস করার জন্য আসল উদ্দেশ্য ছিল মূল ধারায় আনা। এখন সবকিছুতেই আছে। এমনকি অর্থমন্ত্রণালয়েও উইমেন্স ডেভেলপমেন্ট, 
উইমেন্স এম্পাওয়ারমেন্ট এর উপর কোশ্চেন পেপার 
আছে। একজনের জায়গায় যদি দশজনও চিন্তা করে সেটাইতো সফলতা। এখন সুবিধাটা সবাই ভোগ করতে পারছি।

আমরা হয়তো চলাটা শুরু করে দিয়েছিলাম এই যা। তবে কোথায়ও কোথায়ও এর কার্যকারিতা একটু কম এটা নিশ্চিত করতে হবে এই চাকা থামলে চলবে না। এখন দরকার লিঙ্গ বৈষম্য দুরীকরণ। আমি আশা করি হবে। চেষ্টা চলছে, লেখালেখি হচ্ছে পত্র পত্রিকায়। পেপার খুললে প্রত্যেক পাতায় এমনকি বিজনেস পাতায়ও ছেলেদের সাথে অন্তত একটা নারী আছে প্রত্যেক জায়গায়। এটা ইতিবাচক। এটাই আমরা চাইতাম সবজায়গায় মেয়েদের অস্তিত্ব থাকবে। তার মানে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি।

এখনকার মেয়েদের চ্যালেঞ্জটা আর আপনাদের সময়কার চ্যালেঞ্জটার মধ্যকার তুলনায় আপনি কি বলবেন?

আমাদের তুলনায় এখনকার মেয়েদের চ্যালেঞ্জটা বেশী। নারী সহিংসতা তো এখন কেবল বড় সমস্যাই নয় বরং একটা মারাত্মক ব্যাধি হিসাবে রূপ নিয়েছে। অনে?