নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন

ডাঃ শাকিল তানভির, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, বেতাগী – পটুয়াখালী ০৫:৩৭ মিঃ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ Views : 639

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ( এসডিজি) এর ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অন্যতম হল নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন যা স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় অপরিহার্য। তাছাড়াও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য-ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল নিরাপদ পানি ও পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতা বা স্যানিটেশন।

স্যানিটেশনঃ

সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর পরিবেশই হল স্যানিটেশন। স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও মলমূত্র নিষ্কাশন, গৃহস্থালির বর্জ্য, পানি ও ময়লা-আবর্জনা অপসারণ এবং ব্যক্তিগত ও পরিবেশের তথা পারিপার্শ্বিক পরিচ্ছন্নতাই স্যানিটেশনের অন্তর্ভুক্ত।

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্যানিটেশনের ভুমিকাঃ

শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা। মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ রোধ করা । মলমুত্র ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ, যেমন- কলেরা,টাইফয়েড, জন্ডিস ইত্যাদি থেকে মুক্তি পাওয়া। বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণুর সংক্রমণ ও বিস্তার রোধ করা। ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ।


অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের প্রভাবঃ

অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের প্রভাব বহুমুখী। একদিকে এটি মানুষের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে অন্যদিকে এটি পরিবেশকেও হুমকির সম্মুখীন করে।  অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের কারণে মানুষ নানা ধরনের সংক্রামক ও ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যেমন- ডায়রিয়া, আমাশয়, কৃমি ও কৃমিজনিত রোগ, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, চর্মরোগ, চোখের অসুখ প্রভৃতি।  এছাড়াও, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের প্রভাবে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ হতে পারে যা পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে গেলে পরিবেশস্থ সকল প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনচক্র ব্যাহত হয় যা ক্রমান্বয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনে।
 

প্রতিরোধঃ

খোলা স্থানে বা যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হবে। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। জমে থাকা সকল প্রকার ময়লা আবর্জনা অপসারণ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। যখনই মল ও ময়লা আবর্জনা হাতের সংস্পর্শে আসবে তখনই দু’হাত সাবান  ও পরিস্কার পানি দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলতে হবে। যেখানে সেখানে থুথু ও কফ ফেলা থেকে বিরত  থাকতে হবে। রান্না ও গৃহস্থালি কাজে সবসময় নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে হবে। খাবার আগে অবশ্যই ভাল করে হাত ধুয়ে নিতে হবে এবং হাতের নখ ছোট রাখতে হবে।
সর্বোপরি, নিজের ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা বজায়  রাখতে হবে এবং পরিবেশ দূষণ রোধে সচেতন থাকতে হবে।

স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনঃ

 স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন হল এমন একটি ল্যাট্রিন বা পায়খানা যা ব্যবহারের ফলে মলমূত্র একটি নির্দিষ্ট স্থানে এমনভাবে আবদ্ধ করা হয় যা কোনভাবেই সরাসরি খোলা বাতাস, ভূপৃষ্ঠের পানি ও মাটি, পরিবেশের কীটপতঙ্গ, পশুপাখি ও মানুষের সংস্পর্শে আসতে পারে না। ফলে মলমূত্র থেকে রোগজীবাণু ও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ করে না।

স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনের জন্য স্থান নির্বাচনঃ

ল্যাট্রিনের জন্য আলাদা স্যান্ডেল ব্যবহার করা, ল্যাট্রিনের ভিতর পানি ও সাবানের ব্যবস্থা রাখা, মলত্যাগের পর শৌচকাজ ও হাত ধোয়ার জন্য সাবান ও পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার করা, প্যানে পর্যাপ্ত পানি ঢালা যেন প্যানে মল লেগে না থাকে, কিছুদিন পর পর প্ল্যাটর্ফর্ম সহ ল্যাট্রিনটি পরিস্কার করা।

নিরাপদ পানিঃ

যে পানিতে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর রোগজীবাণু নেই এবং সহনীয় মাত্রার থেকে অতিরিক্ত আর্সেনিক ও লৌহ সহ অন্যান্য খনিজ বা রাসায়নিক দ্রব্য নেই তাকেই নিরাপদ পানি বলে।

নিরাপদ পানির বৈশিষ্ট্যঃ

বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন, রোগজীবাণু ও ময়লামুক্ত, মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রার থেকে কম রাসায়নিক ও খনিজ পদার্থ যুক্ত।

নিরাপদ পানি কেন প্রয়োজন?

স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরাপদ পানি প্রয়োজন। যেমন- 
পান করার জন্য
হাত ধোয়ার জন্য
থালাবাসন পরিস্কার করার জন্য
শাকসবজি ও ফলমূল ধোয়ার জন্য
রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য

পানি দূষণের কারণঃ

মানুষ ও পশু-পাখির মল-মূত্র পানিতে মিশলে মৃত জীবদেহ ও ময়লা-আবর্জনা পানিতে ফেললে পানিতে থালা-বাসন মাজলে, কাপড় কাচলে ও গরু মহিষ গোসল করালে ফসলের জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পানিতে মিশলে কলকারখানার বর্জ্য ও লঞ্চ-স্টীমার থেকে নির্গত জ্বালানী তেল পানিতে মিশলে প্লাস্টিক, পলিথিন পানিতে ফেললে এবং বাঁশ, পাট পানিতে পচালে ল্যাট্রিনের পিট হতে পানির উৎস কাছাকাছি থাকলে নলকূপের গোড়া বাঁধানো না থাকলে।

নিরাপদ পানির উৎস:

আর্সেনিকমুক্ত নলকূপ ও গভীর নলকূপের পানি চারপাশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং ঢাকনাযুক্ত কূয়োর পানি
বৃষ্টি শুরুর ১৫ মিনিট পর পরিস্কার টিনের চাল ও ছাদ হতে সংগৃহীত বৃষ্টির    পানি পন্ড-স্যান্ড ফিল্টারের (চঝঋ) মাধ্যমে পরিশোধিত পানি পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পরিশোধিত পানি ফুটিয়ে বা অন্যভাবে বিশুদ্ধকৃত ভূপষ্ঠস্থ পানি।

ভূপৃষ্ঠস্থ পানি নিরাপদকরণ:

পানি ফুটিয়ে- পানির পাত্র চুলার উপর রেখে তাপ দিতে হবে। পানি ফুটে যাওয়ার পর জীবাণু ধ্বংস করতে আরও ২০ মিনিট টগবগ করে ফুটাতে হবে। ঠান্ডা হওয়ার পর পানি ব্যবহার উপযোগী হবে।
বি:দ্র:- পানি ফুটিয়ে আর্সেনিক দূর করা যায় না।

পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি বা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে: 
একটি পাত্রে ২০ লিটার পানি নিয়ে তাতে ২টি পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি বা ৫ মিলিগ্রাম (চা চামচের চার ভাগের একভাগ) বিøচিং পাউডার মিশিয়ে ভালভাবে নাড়তে হবে। ৩০ মিনিট পর পানি ব্যবহার উপযোগী হবে।

ফিটকিরি দিয়ে: 
একটি পাত্রে ২০ লিটার পানি নিয়ে তাতে ১০ মিলিগ্রাম ফিটকিরি মিশিয়ে ভালভাবে নাড়তে হবে। এক ঘন্টা পর উপরের ৯০% পরিস্কার পানি অন্য একটি পাত্রে ঢালতে হবে। তলানি সহ বাকি ১০% পানি ফেলে দিতে হবে।

বি:দ্র:- ফিটকিরি দিয়ে পানি সম্পুর্ণভাবে জীবাণুমুক্ত করা যায় না। তবে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় দূষিত পানি ব্যবহার করা থেকে এটি তুলনামূলকভাবে ভালো।