ফ্রিজে খাবার রাখার সময় মনে রাখুন কিছু বিষয়

সংবাদ প্রতিনিধি ০৪:১৯ মিঃ, মে ৬, ২০১৮ Views : 500

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে খাদ্য। খাবার ছাড়া আমরা একটি দিনও চিন্তা করতে পারি না। আমাদের শরীরের শক্তির একটি বড় উৎস হচ্ছে এই খাবার। তাই খাবারকে রাখা উচিৎ সুন্দর ভাবে আর সংরক্ষণের বেলায় হওয়া উচিৎ সচেতন। খাবার সংরক্ষণের কথা শুনলে আমাদের মাথায় সবার আগে যে শব্দটি আসে তা হচ্ছে ফ্রিজ। ফ্রিজ ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন চিন্তা করা অসম্ভব। তাই এই ফ্রিজেরও চাই যত্ন। আর খাবার রাখা উচিৎ সঠিকভাবে। খাবার যদি সঠিকভাবে গুছিয়ে রাখা না হয় তাহলে দেখা যাবে ফ্রিজে জমে গিয়েছে ময়লা আর তাতে সৃষ্টি হয়েছে দুর্গন্ধ।

আমরা খাবার বেশি দিন সংরক্ষণ করতে ফ্রিজে রেখে দেই। তবে আমরা অনেকেই জানিনা যে, খাবার কিভাবে ফ্রিজে সয়রক্ষণ করতে হয়। সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ না করলে অনেকসময় খাবারের মান কমে যায় আবার ক্ষতিকরও হয়ে ওঠে।

বহুদিন ফ্রিজ ব্যবহারের পরেও অনেকেই জানি না ফ্রিজে খাবার রাখার নিয়ম-কানুন। ফ্রিজে কাঁচা খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি এক রকম আবার রান্না করা খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি আরেক রকম। এ দুই ধরনের খাবার ফ্রিজে আলাদা করে রাখা উচিত। সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ না করলে খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায় এমনকি খাবার বিষে পরিণত হতে পারে। তাই আজ থাকছে খাবার কিভাবে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা যায় বা ফ্রিজে খাবার রাখার বিষয়ে কিছু পরামর্শ।

সাধারণত ডিপ ও নরমাল- এ দুই ভাগে বিভক্ত থাকে ফ্রিজ। এর মধ্যে কাঁচা মাংস, মাছ ইত্যাদি ডিপ অংশে এবং সবজি, ফল ইত্যাদি নরমাল অংশে রাখা হয়।

আমরা অনেকেই ভাবি ফ্রিজে খাবার ঢুকিয়ে রাখা মানে তা ঠিক থাকবে। তবে ঠাণ্ডার কারণে ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে কাজ করে। তাই ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে তা অবশ্যই গরম করে নিয়ে তবেই খাবেন।

ফ্রিজের তাপমাত্রা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রিজে আলাদা আলাদা তাপমাত্রায় খাবার রাখা উচিত। অবশ্যই ফ্রিজের তাপমাত্রার দিকে খেয়াল রাখবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কমাবেন এবং বাড়িয়ে দেবেন। বক্সে করে ফ্রিজে খাবার রাখতে হবে, বক্সগুলোর মাঝে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রাখবেন। তাহলে ভেতরে বাতাস চলাচল করতে পারবে। ফ্রিজের নরমাল অংশের তাপমাত্রা সব সময় ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকা রাখতে হবে। আর ডিপ ফ্রিজের তাপমাত্রা হওয়া উচিত ০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অথবা-১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেটের আশপাশে। অনেকে মাসের পর মাস ডিপ ফ্রিজে মৌসুমি ফলমূল রেখে দেন। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সংরক্ষণের নিয়মাবলি মেনে তারপর রাখতে হবে। তবে বেশি দিন রাখা উচিত না।

আর কয়েকটি টিপস
১. দরজার একেবারে নিচের তাকে ফলের রস, সস, জ্যাম, পানি রাখা যায়। এবং ইনসুলিন জাতীয় ওষুধ রাখা যাবে।

২. ফ্রিজের নিচের তাকে রাখুন দুধ। ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা দুধ রাখার জন্য উপযুক্ত। তবে খাওয়ার কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে তা বের করে নিতে হবে। এতে দুধের গুণগত মান নষ্ট হয় না। দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য টক দই ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে।

৩. ফ্রিজের গায়ের সঙ্গে লাগিয়ে কোনো খাবার রাখবেন না। বিশেষ করে কোনো রকমের তাজা ফলমূল বা সবজি একেবারেই না।

৪. মাখন তো ফ্রিজে রাখতেই হয়, ঘি-কেও ফ্রিজে রাখতে পারেন অনেকদিন ভালো রাখার জন্য। তবে দুটিই রাখবেন একদম এয়ার টাইট পাত্রে।

৫. সাধারণ কাঁচা মাছ ও মাংস রাখতে ফ্রিজের ডিপ অংশ ব্যবহার করা হয়। কাঁচা মাছ, মাংস ১ ডিগ্রির কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করুন। কাঁচা মাছ, মাংস এবং পোলট্রি প্রডাক্ট বাকি খাবারের সঙ্গে রাখবেন না। কারণ অনেক সময়ই কাঁচা মাছ-মাংস থেকে পানি বের হয়। সেই পানি বাকি খাবারে মিশে গেলে বিষক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। ফ্রিজে যেমন মাংসই রাখুন না কেন, সেগুলো অবশ্যই ভালো করে ধুয়ে একদম পরিষ্কার করে রাখুন। এটা মাংসে বাজে গন্ধ হবে না, অনেকদিন পর্যন্ত সতেজ থাকবে, স্বাদ থাকবে অক্ষুণ্ণ।

৬. আইসক্রিম ও প্যাকেটজাত ফ্রোজেন ফুড ফ্রিজে রাখার ব্যাপারে সতর্ক হোন যেমন : রোল, সিঙ্গারা, সমুচা, পিঠা ইত্যাদি খাবার ফ্রিজের ডিপ অংশে রাখা যাবে। তাপমাত্রার সামান্য হেরফেরে এই খাবার নষ্ট হয়ে যায়।

৭. রান্না করা খাবার ফ্রিজে রাখার নিয়ম : রান্না করা খাবার ফ্রিজের নরমাল অংশের ওপরের তাকে রাখা যাবে। খাবার কখনই ৪ দিনের বেশি ফ্রিজে রাখা যাবে না। আর রান্না করা গরু, খাশি বা মুরগির মাংস এবং ডিম ফ্রিজে রাখতে পারবেন ৩-৪ দিন। একইভাবে রান্না করা মাছও ৩-৪ দিনের বেশি ফ্রিজে রেখে খাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে আরেকটি সহজ নিয়ম খুব কাজে আসে। ১-২ দিনের খাবারের ঠিক পেছনে যদি সবেমাত্র রান্না করা খাবার রাখা যায়, তাহলে দেখা গেছে বাসি খাবার বেশিক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকে।

৮. ফল এবং সবজি রাখার নিয়ম : ফ্রিজে রাখা মাত্র বিশেষ কিছু ফলের শরীর থেকে ইথাইলিন গ্যাস বের হয়, যা টাটকা সবজিকে নিমেষে নষ্ট করে দেয়। তাই কলা, জাম, নাশপাতি এবং টমেটো ফ্রিজে না রাখা ভালো। একইভাবে যেসব সবজির শরীর থেকে ইথাইলিন গ্যাস বের হয়, সেগুলোকে ফলের থেকে দূরে রাখতে হবে। ব্রকলি, গাজর, শসা, বেগুন, মটরশুঁটি, লেটুস প্রভৃতি সবজির সঙ্গে ফল রাখবেন না।

* সবজি বা ফল এয়ার টাইট কনটেইনারে রাখা যাবে না।

* সবজি পলিথিনের ব্যাগে রাখবেন না। সবজি রাখুন কাগজের প্যাকেটে কিংবা খবরের কাগজ দিয়ে মুড়ে। অনেকদিন সতেজ থাকবে। কিছু সবজি একটু ভিন্নভাবে রাখতে হয় ফ্রিজে। যেমন : মরিচের বোঁটা ফেলে রাখবেন, বা কাচের বয়ামের মধ্যে কাঁচা মরিচ রাখলে তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ভালো থাকে। শাক কুটে রাখবেন, ধনে পাতা রাখবেন গোড়াসহ। সংরক্ষণ উপযোগী মৌসুমি সবজি সিদ্ধ করার পর বিভিন্ন বক্সভর্তি করে ফ্রিজে রাখা যায়। এতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সবজিগুলোর গুণগতমান ভালো থাকবে। আর মৌসুম শেষে সেগুলো রান্না করে খাওয়া যাবে। বেগুনে একটু তেল মেখে রাখতে পারেন।

৯. ফ্রিজে কাটা পেঁয়াজ রাখতে চাইলে পেঁয়াজ একটি এয়ার টাইট বক্সে রেখে সামান্য লবণ ছিটিয়ে দিন। তারপর বক্সটি মুখ বন্ধ করে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নিন। এছাড়া বাটা মসলা ফ্রিজে রাখতে চাইলে তা বক্সভর্তি করে রাখা যাবে।

১০. বেশিরভাগ ফ্রিজেই ডিম রাখার আলাদা জায়গা থাকে। ফ্রিজে ডিম রাখার সময় মোটা অংশটি নিচের দিকে ও সরু অংশটি ওপরে রাখুন। ডিম হাতলে না রেখে বাটিতে করে ফ্রিজের ভেতরে রাখুন।

* খুব বেশি খাবার একসঙ্গে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে রাখতে পারেন। একসঙ্গে যদি বেশি খাবার রেখে দেন, তাহলে বের করে রান্নার আগে কাঁচা মাছ বা মাংস পুরোটাই আপনাকে ভিজিয়ে রাখতে হবে। আবার রান্না করা খাবার পুরোটাই জ্বাল দিতে হবে। এতে করে খাবারের পুষ্টি ও স্বাদ দুটোই নষ্ট হয়।

* ফ্রিজে খাবার রাখতে বি পি এ-ফ্রি লেবেল লাগানো প্লাস্টিকের কনটেইনার ব্যবহার করতে হবে। কাচের এয়ার টাইট কনটেইনারে খাবার রাখতে হবে। এবং ফ্রিজে সর্বদা এক টুকরো কাটা লেবু রাখুন। মাঝে মাঝে বেকিং সোডা মেশানো পানি দিয়ে ফ্রিজ মুছে নিন। এতে এক খাবারের গন্ধ অন্য খাবারে প্রবেশ করবে না। ফ্রিজে দুর্গন্ধ হবে না।

কোন খাবার কতদিন ফ্রিজে রাখা যাবে
** হট ডগ, পিৎজা, চিকেন প্যাটিস বা বার্গার জাতীয় খাবার খোলা অবস্থায় ১ সপ্তাহ, না খোলা অবস্থায় ২ সপ্তাহ।

** কাঁচা মাংস ফ্রিজে রাখলে ৩-৫ দিন ভালো থাকে। কাঁচা মুরগির মাংস আস্ত অবস্থায় ডিপ ফ্রিজে প্রায় ১ বছর ভালো থাকে। আর কাটা অবস্থায় ৫-৬ মাসের মধ্যে রান্না করে ফেলাই ভালো।

** স্যুপ সাধারণত ৩-৪ দিন ভালো থাকে। রান্না করা মুরগির মাংস, মাছ বা ডিমের কোনো পদ ৩-৪ দিন ফ্রিজে রাখা যাবে।